হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা: মাইন অপসারণে ছয় মাস লাগতে পারে, অনিশ্চয়তায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার

 

ভিনিউজ : মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই প্রণালিতে পুঁতে রাখা সম্ভাব্য নৌ-মাইন অপসারণ করতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত কমে এলেও জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কংগ্রেসের হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্যদের সঙ্গে এক গোপন ব্রিফিংয়ে পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই সময়সীমার কথা উল্লেখ করেন। ওই ব্রিফিং সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ইরান হরমুজ প্রণালির আশপাশে বিভিন্ন ধরনের মাইন পুঁতে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জটিল ও সময়সাপেক্ষ অভিযান প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মাইনের কিছু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত মাইনও থাকতে পারে। ফলে এগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ছোট নৌযান ব্যবহার করেও মাইন পোঁতা হয়ে থাকতে পারে, যা গোটা অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে অচলাবস্থা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। পেন্টাগনের এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যাচ্ছে, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

রাজনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো অগ্রগতি নেই। ইরানের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও চাপকে প্রধান বাধা হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরোপিত নৌ অবরোধ ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে কয়েক ডজন জাহাজ আটকে দিয়েছে। যদিও কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলছে, কিছু জাহাজ অবরোধ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে—তবে এই দাবি যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকার করেছে।

এদিকে, ইরানও পাল্টা অবস্থান নিয়েছে। তারা অভিযোগ করছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আগ্রাসী নীতিই এই অঞ্চলে অস্থিরতার মূল কারণ। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার অধিকার অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজ জব্দ করার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ পরিস্থিতি শান্ত করতে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, ইরানের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যেতে পারে এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধান সম্ভব।

তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, একদিকে সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণের দীর্ঘ সময়সীমা পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইউরোপীয় দেশগুলোও এই সংকটের প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছে। জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন আর কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত সমাধানের পথে যাচ্ছে না। মাইন অপসারণ, সামরিক উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং কূটনৈতিক সমঝোতা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রয়োজন। তা না হলে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায়।
-বিবিসি

পূর্বের খবরসংসদে রুমিন ফারহানা: লোডশেডিং ঢাকায় ১-২ ঘণ্টা, গ্রামে ১৪ ঘণ্টা
পরবর্তি খবরকাস্টিং কাউচ’ মন্তব্যে বিতর্কে হংসিকা: সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!