সিলিন্ডার গ্যাসের দাম লাগামহীন : মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস

 

আসাদুজ্জামান সুমন

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ : রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা বিরাজ করছে। সরকার নির্ধারিত ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩৪১ টাকা থাকলেও বাস্তবে ভোক্তাদের তা কিনতে হচ্ছে ২০০০ থেকে ২২০০ টাকায়। ফলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার, যাদের মাসিক আয়ের বড় অংশ এখন রান্নার জ্বালানিতেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে দেশে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি সরবরাহ হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ সরবরাহ ঘাটতির কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। তারপরও বাজারে কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ উঠছে। ভোক্তাদের দাবি, অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলারদের সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়িয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি সিলিন্ডারে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। উত্তরার আব্দুল্লাহপুরের বাসিন্দা নাজির বলেন, তিন-চারটি দোকান ঘুরেও সরকারি দামে সিলিন্ডার পাইনি। ২২০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। সীমিত বেতনের চাকরি করি, এভাবে চললে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।”

এই সংকট সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর। নিম্ন আয়ের মানুষ অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি যেমন কাঠ বা কয়লার দিকে ঝুঁকতে পারলেও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো শহুরে জীবনে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে তাদের জন্য এলপিজি ব্যবহার প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাসাভাড়া, খাদ্যপণ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে তাদের আর্থিক চাপ বহুগুণে বেড়েছে।

লালবাগের বাসিন্দা আকরাম হোসেন জানান, “গত মাসে যে সিলিন্ডার ১৫০০ টাকায় কিনেছি, সেটাই এখন ২১০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সরকারি দাম শুধু কাগজে আছে, বাস্তবে নেই।” তার মতো হাজারো মধ্যবিত্ত পরিবার প্রতিনিয়ত এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা নিজেরাও বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের দাবি, ডিলার পর্যায়েই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। টঙ্গীর এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ডিলারের কাছ থেকেই বেশি দামে কিনছি। তাই বেশি দামে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই।” অর্থাৎ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি অস্পষ্ট মূল্যচক্র কাজ করছে, যার দায় কেউই সরাসরি নিচ্ছে না।

এদিকে এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নেতারা বলছেন, কোম্পানিগুলোই দাম বাড়িয়েছে। তাদের দাবি, প্রতি সিলিন্ডারে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ফলে সরকারি নির্ধারিত দামে বিক্রি করা তাদের পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। এতে বোঝা যায়, উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলেই মূল্যনিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ হলো নজরদারির ঘাটতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলমের মতে, “বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা না থাকায় একটি গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণেই এ ধরনের নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর ও প্রতিযোগিতা কমিশন, এদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। কোনো লাইসেন্স বাতিল বা কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।”

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় এবং বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এই দাবি প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কারণ নির্ধারিত দাম ও বাজারমূল্যের মধ্যে এত বড় ব্যবধান থাকলেও কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবিত্তের ওপর এই চাপ দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। ক্রমাগত ব্যয় বৃদ্ধি তাদের সঞ্চয় কমিয়ে দিচ্ছে, জীবনযাত্রার মান নিচে নামাচ্ছে এবং মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে রান্নার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে বা খরচ বাঁচাতে অন্য খাতে কাটছাঁট করছে।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন, ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, মূল্যতালিকা বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাতিল। পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে নতুন উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, এলপিজি বাজারের এই অস্থিরতা শুধু একটি জ্বালানি সংকট নয়; এটি মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি আঘাত হানা একটি অর্থনৈতিক সংকট। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই চাপ আরও তীব্র হয়ে উঠবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছাবে।

পূর্বের খবর৪৮ দলের বিশ্বকাপ চূড়ান্ত, একনজরে ১২টি গ্রুপে কে কার প্রতিপক্ষ
পরবর্তি খবররুশ জ্বালানি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ছাড় চায় বাংলাদেশ