সাতক্ষীরার আম : যেভাবে দখল করছে দেশের আমের বাজার, যাচ্ছে বিদেশে

 

বিশেষ প্রতিবেদন

আদিত্য সুমন

ভিনিউজ : একসময় সাতক্ষীরার নাম শুনলেই মানুষের চোখে ভেসে উঠত সুন্দরবন কিংবা চিংড়ি ঘেরের ছবি। কিন্তু গত এক দশকে এই পরিচিতির সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে আম। দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে আম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত হলেও এখন সেই তালিকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। বিশেষ করে মৌসুমের শুরুতেই বাজারে আম পৌঁছে দেওয়ার কারণে সাতক্ষীরার আম দেশের বাজারে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।

সাতক্ষীরার কলারোয়া এলাকার আম চাষি জানান, এ বছর ঝড় তুলনামূলক কম হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে। যদিও কিছু পোকার আক্রমণ ছিল, তবুও আমের উৎপাদন সন্তোষজনক। মৌসুমের শুরুতেই গোবিন্দভোগ আম উনিশশ থেকে চব্বিশশ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। এতে চাষিরাও ভালো দাম পাচ্ছেন।

জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হওয়ার আগেই সাতক্ষীরার আম বাজারে আসতে শুরু করেছে। কৃষি বিভাগের ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী দেশের মধ্যে সবচেয়ে আগে এই জেলার আম সংগ্রহ শুরু হয়। ইতোমধ্যে গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগ আম বাজারে এসেছে। এরপর পর্যায়ক্রমে হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্রপালি বাজারে আসবে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সাতক্ষীরার ভৌগোলিক অবস্থানই এই আগাম আম উৎপাদনের প্রধান কারণ। আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জানান, অক্ষাংশের তারতম্যের কারণে সাতক্ষীরায় আম আগে পাকে। উপকূলীয় এই জেলার অবস্থান দেশের উত্তরাঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণে হওয়ায় এখানকার তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে আমের মুকুল দ্রুত ফোটে এবং ফলও আগে পরিপক্ব হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রতি ডিগ্রি অক্ষাংশ বৃদ্ধির ফলে আম সংগ্রহের সময় প্রায় তিন দিন পিছিয়ে যায়। সেই হিসেবে রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জে একই জাতের আম সাতক্ষীরার তুলনায় এক থেকে দুই সপ্তাহ পরে বাজারে আসে।

সাতক্ষীরার মাটির লবণাক্ততাও আম দ্রুত পরিপক্ব হওয়ার আরেকটি কারণ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র জানান, উপকূলীয় এলাকায় মাটিতে লবণের উপস্থিতির কারণে ফসলের জীবনচক্র কিছুটা ছোট হয়। ফলে আমও দ্রুত পাকতে শুরু করে।

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে, আগেভাগে বাজারে আসা আম কি কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়? কৃষি গবেষকরা বলছেন, সাতক্ষীরার আম প্রাকৃতিকভাবেই আগে পাকে। এর সঙ্গে রাসায়নিক ব্যবহারের কোনো সম্পর্ক নেই। একই জাতের আমের স্বাদেও তেমন পার্থক্য দেখা যায় না। তবে মাটি ও আবহাওয়ার কারণে সাতক্ষীরার আমে মিষ্টতার পরিমাণ কিছুটা বেশি হতে পারে।

কৃষিবিদদের মতে, সাতক্ষীরার হিমসাগর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরসাপাত মূলত একই জাতের আম। কিন্তু উপকূলীয় আবহাওয়া ও লবণাক্ত মাটির কারণে সাতক্ষীরার আমে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে, যা স্বাদে আলাদা মাধুর্য এনে দেয়।

বর্তমানে সাতক্ষীরার আম শুধু দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। বিদেশেও এই জেলার আমের চাহিদা বাড়ছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ বছর প্রায় একশ টন আম বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে নিরাপদ ও বিষমুক্ত চাষাবাদ এবং ফল মোড়কজাত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন বিপণিবিতানেও সাতক্ষীরার আম জায়গা করে নিয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর চার হাজার একশ চল্লিশ হেক্টর জমিতে প্রায় বারো হাজার তিনশ কৃষক আম চাষ করেছেন। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সত্তর হাজার মেট্রিক টন।

লবণাক্ততা ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে অনেক কৃষক এখন ধান বা অন্যান্য ফসলের পরিবর্তে আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কারণ আম চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি। ফলে প্রতি বছরই সাতক্ষীরায় আমের বাগান বাড়ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভৌগোলিক সুবিধা, আগাম বাজারজাতকরণ, ভালো স্বাদ এবং রপ্তানি সম্ভাবনার কারণে সাতক্ষীরার আম এখন দেশের আম অর্থনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

পূর্বের খবরহাম ও উপসর্গে মৃত্যু ৫০০ ছুঁই ছুঁই, ঢাকায় ২১০
পরবর্তি খবরজিনিউজ : মাত্র ১৩ বছরেই ৪৩-এর পরিচালককে বিয়ে, পরিবর্তন করেন ধর্মও: একলা মা হিসেবে লড়াই