মাটিতে হাত মাখানো কেন স্বাস্থ্যের জন্য ভালো

 

লেখক: বেকা ওয়ার্নার
বিবিসি

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু চোখে দেখার বা দূর থেকে উপভোগ করার বিষয় নয়। মাটি ছোঁয়া, গাছের বাকল স্পর্শ করা কিংবা ঘাসের ওপর খালি হাতে বসার মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে স্বাস্থ্যের নানা উপকার। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে, প্রকৃতির মাটি ও উদ্ভিদের সংস্পর্শে এলে মানুষের ত্বকে থাকা অণুজীবের বৈচিত্র্য বাড়তে পারে, যা ত্বকের পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিদিন পার্কে হাঁটতে যাওয়া অনেকেরই অভ্যাস। গাছপালা দেখা, ফুলের ঘ্রাণ নেওয়া কিংবা পাখির ডাক শোনা-প্রকৃতির সঙ্গে এই যোগাযোগ আমাদের মানসিকভাবে প্রশান্ত করে। কিন্তু হাঁটতে গিয়ে মাটি, গাছের গুঁড়ি কিংবা ঘাস স্পর্শ করার কথা আমরা অনেক সময় ভাবিই না।

ফিনল্যান্ডের পরিবেশ বিষয়ক গবেষক মিরা গ্রোনরুসের গবেষণা অবশ্য বলছে, প্রকৃতির সঙ্গে শারীরিক সংস্পর্শের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ২০ সেকেন্ড ধরে মাটি, পিট ও শ্যাওলা দিয়ে হাত ঘষতে বলা হয়েছিল। এরপর তারা কলের পানিতে হাত ধুয়ে নেন। গবেষকেরা দেখতে পান, হাত ধোয়ার পরও ত্বকে থাকা অণুজীবের সংখ্যা ও বৈচিত্র্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে।

গ্রোনরুসের ভাষায়, খালি চোখে হাত পরিষ্কার দেখালেও ত্বকের অণুজীবের জগতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
বিষয়টি প্রথমে কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। আমরা সাধারণত ব্যাকটেরিয়াকে জীবাণু ও রোগের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু মানুষের শরীরের সব ব্যাকটেরিয়া ক্ষতিকর নয়। বরং ত্বকে বিভিন্ন ধরনের অণুজীবের একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ থাকলে তা ক্ষতিকর ও রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য ঠেকাতে সাহায্য করতে পারে।

অর্থাৎ, ত্বকে যত বেশি বৈচিত্র্যময় ও উপকারী অণুজীব থাকবে, ক্ষতিকর জীবাণুর জন্য সেখানে আধিপত্য বিস্তার করা তত কঠিন হতে পারে। তবে মাত্র ২০ সেকেন্ড প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকলেই দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন হবে-এমনটা বলা যাচ্ছে না। গ্রোনরুসের গবেষণায় দেখা গেছে, অণুজীবের এই পরিবর্তন খুব দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। তাই নিয়মিত ও দীর্ঘ সময় প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকার বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

শিশুদের মাটিতে খেলতে দেওয়া কি ভালো?

ফিনল্যান্ডের কয়েকটি শিশুযত্নকেন্দ্রে এখন এ বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা চলছে। দেশটির বিভিন্ন ডে-কেয়ার সেন্টারের শিশুদের নিয়মিত প্রকৃতির সংস্পর্শে রাখা হচ্ছে। তাদের খেলার জায়গায় রয়েছে গাছ, কাঠের টুকরা, বালি, মাটি, ঝোপঝাড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান।

মধ্য ফিনল্যান্ডের অরিনকোলিন্না ডে-কেয়ার সেন্টারের শিশুরা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বাইরে খেলাধুলা করে। কখনো তারা গাছের নিচে দৌড়ায়, কখনো দড়িতে ওঠে, বালু দিয়ে দুর্গ বানায় কিংবা পানিতে লাফায়। মাটি ও কাঠের টুকরো নিয়ে খেলতে গিয়ে দিনের শেষে তাদের শরীর অনেকটাই কাদামাখা হয়ে যায়।

গবেষকেরা এখন জানতে চাইছেন, প্রতিদিন এভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন হয়।

এর আগে ২০১৬-১৭ সালে পরিবেশবিজ্ঞানী মারজা রসলুন্ডের নেতৃত্বে একটি গবেষণায় একটি ডে-কেয়ারের খেলার জায়গায় বনভূমির মাটি, পিট ও গাছ লাগানোর বাক্স যুক্ত করা হয়েছিল। শিশুরা সেখানে নিয়মিত খেলার পর তাদের ত্বক, লালা ও অন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়ার পরিবর্তন পরীক্ষা করা হয়।

ফলাফল ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। পাকা বা কংক্রিটের জায়গায় খেলা শিশুদের তুলনায় বনভূমির মতো পরিবেশে খেলা শিশুদের ত্বকে অণুজীবের বৈচিত্র্য বেশি পাওয়া যায়। এমনকি এক বছর পরও এই পার্থক্য দেখা গিয়েছিল।

রসলুন্ডের মতে, ত্বকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে। ফলে কোনো একটি রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর অতিরিক্ত আধিপত্য বিস্তার করার সুযোগ কমে যায়।

তিনি বিষয়টিকে বোঝাতে একটি চমৎকার তুলনা করেছেন-রোগ যেন একজন স্বৈরশাসক, আর সুস্থ ত্বক যেন একটি গণতন্ত্র। অর্থাৎ, ত্বকে যত বেশি বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য থাকবে, কোনো একটি ক্ষতিকর জীবাণুর আধিপত্য তত কম হবে।
ত্বকের সুস্থতার সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সম্পর্ক

মানুষের ত্বক শুধু শরীরের বাইরের আবরণ নয়। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ত্বকে থাকা অণুজীবের বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য শরীরের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

রসলুন্ডের আরেকটি গবেষণায় শিশুদের দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। একদল শিশু এমন একটি বালুর বাক্সে খেলেছে যেখানে অণুজীবের বৈচিত্র্য বেশি ছিল। অন্যদল খেলেছে দেখতে একই রকম, কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম অণুজীবসমৃদ্ধ বালিতে।

দেখা যায়, বৈচিত্র্যময় অণুজীব সমৃদ্ধ মাটির সংস্পর্শে আসা শিশুদের ত্বকে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বেড়েছে। শুধু ত্বকেই পরিবর্তন হয়নি; তাদের রক্তে সাইটোকাইন নামের কিছু রোগ প্রতিরোধী সংকেতবাহক পদার্থেও পরিবর্তন দেখা গেছে। এসব পরিবর্তন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষকেরা বিশেষভাবে গামাপ্রোটিওব্যাকটেরিয়া নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার দিকে নজর দিয়েছেন। বনভূমির মতো পরিবেশে খেলা শিশুদের ত্বকে এই ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বাড়ার সঙ্গে নিয়ন্ত্রক টি-সেল বা টি-রেগ কোষের বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এই কোষগুলো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং শরীরের নিজস্ব কোষের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া ঠেকাতে সহায়তা করে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। প্রকৃতির সংস্পর্শে এলেই হাঁপানি, একজিমা বা অ্যালার্জির মতো রোগ হবে না-এমন নিশ্চয়তা গবেষণা এখনো দেয়নি।

গ্রোনরুসের মতে, প্রকৃতির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এসব রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে-এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে। কিন্তু এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে প্রকৃতির সংস্পর্শ এসব রোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

বাগান করাও হতে পারে সহজ সমাধান

প্রকৃতির এই সম্ভাব্য উপকার শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়েও গবেষণা হয়েছে।
একটি গবেষণায় কিছু প্রাপ্তবয়স্ককে শীতকালে ঘরের ভেতরে সবজি চাষ করতে দেওয়া হয়। একদল ব্যবহার করেন অণুজীবের বৈচিত্র্য বেশি থাকা মাটি, আর অন্যদল অপেক্ষাকৃত কম বৈচিত্র্যসম্পন্ন মাটি।

প্রতিদিন এক মাস গাছের পরিচর্যা করার পর দেখা যায়, বৈচিত্র্যময় মাটি ব্যবহারকারীদের ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বেড়েছে। একই সঙ্গে তাদের রক্তে কিছু প্রদাহবিরোধী সাইটোকাইনের মাত্রাতেও পরিবর্তন দেখা গেছে। কম অণুজীবসমৃদ্ধ মাটি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।

গবেষকদের কাছে এ ফলাফল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বন বা বড় পার্কে যাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। বাড়ির ছাদে, বারান্দায় কিংবা ঘরের ভেতরেও গাছ লাগানো এবং মাটিতে হাত দেওয়া হতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগের একটি সহজ উপায়।

ফিনল্যান্ডে অফিসকর্মীদের নিয়েও আরেকটি গবেষণা হয়েছে। কয়েকটি অফিসে জীবন্ত উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি ‘গ্রিন ওয়াল’ বা সবুজ দেয়াল স্থাপন করা হয়। মাত্র দুই সপ্তাহ পর কর্মীদের ত্বকে অণুজীবের বৈচিত্র্য বাড়তে দেখা যায়। একই সঙ্গে রক্তে প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সাইটোকাইনের মাত্রা কমে এবং ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ল্যাক্টোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও বাড়ে।

প্রকৃতির সঙ্গে দূরত্ব কি আমাদের অসুস্থ করছে?

এসব গবেষণার পেছনে রয়েছে ‘বায়োডাইভারসিটি হাইপোথিসিস’ বা জীববৈচিত্র্য-অনুমান। এই ধারণা অনুযায়ী, মানুষ যে পরিবেশে বসবাস করে সেখানে উদ্ভিদ, মাটি, বাতাস ও অণুজীবের বৈচিত্র্য আমাদের শরীরের নিজস্ব মাইক্রোবায়োমের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

আধুনিক নগরজীবনে মানুষ ক্রমেই প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কংক্রিটের রাস্তা, পাকা উঠান, কৃত্রিম পরিবেশ এবং অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতার কারণে মাটি ও প্রকৃতির অণুজীবের সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন যোগাযোগ আগের তুলনায় কমেছে।

গবেষকদের একটি ধারণা হলো, পরিবেশের জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ার সঙ্গে মানুষের কিছু রোগ প্রতিরোধ-সম্পর্কিত সমস্যার উত্থানের একটি যোগসূত্র থাকতে পারে।

তবে এটিও মনে রাখা জরুরি—মাটি বা গাছের সংস্পর্শ মানেই সব ধরনের জীবাণু নিরাপদ, এমন নয়। দূষিত মাটি, পশুর মল, রাসায়নিক বর্জ্য কিংবা রোগজীবাণু বহনকারী পরিবেশ থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই প্রকৃতির সংস্পর্শের ক্ষেত্রে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বেছে নেওয়া জরুরি।

তবু গবেষণাগুলোর সামগ্রিক বার্তা বেশ আশাব্যঞ্জক। প্রতিদিন একটু সময় প্রকৃতির সঙ্গে কাটানো, বাগান করা, গাছের পরিচর্যা করা, ঘাসে বসা কিংবা নিরাপদ পরিবেশে মাটিতে হাত দেওয়ার মতো সহজ কাজ শরীরের অণুজীবের বৈচিত্র্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

মিরা গ্রোনরুস নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বাস্তবে প্রয়োগ করেন। তাঁর সন্তানরা বাইরে থেকে শামুকের খোলস, গাছের বীজ, ডালপালা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক জিনিস কুড়িয়ে আনলে তিনি সাধারণত বাধা দেন না। বরং তাদের সেগুলো নিয়ে খেলতে দেন।

হয়তো সবসময় মাটি মাখা হাতকে আমরা পরিচ্ছন্নতার বিপরীত হিসেবে দেখেছি। কিন্তু নতুন গবেষণা আমাদের সেই ধারণাকে কিছুটা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

পরিচ্ছন্ন থাকা অবশ্যই জরুরি। তবে সুস্থ থাকার জন্য হয়তো প্রকৃতি থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলাও ভালো নয়। কখনো কখনো ঘাস ছোঁয়া, গাছের বাকল স্পর্শ করা কিংবা নিরাপদ মাটিতে হাত মাখানোর মধ্যেও থাকতে পারে শরীরের সঙ্গে প্রকৃতির এক অদৃশ্য যোগাযোগ।

বিবিসির বেকা ওয়ার্নারের ফিচার অবলম্বনে।

পূর্বের খবরবিগ বস্‌ ২০’ শুরুতেই বিতর্কে মাহী বিজ, ‘ডিভোর্সি স্পেশ্যাল’ মন্তব্যে অস্বস্তি
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!