বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শনিবার সকালে মাকিন -ইসরাইেলর যৌথভাবে ইরানে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। হামলার জবাবে ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করেছে।
ইসরায়েলে সাইরেন, আকাশে প্রতিরক্ষা তৎপরতা
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাইরেন বাজানো হয়েছে। নাগরিকদের হোম ফ্রন্ট কমান্ডের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়; তাই নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করাই সর্বোত্তম উপায়।
রাজধানী জেরুজালেমে সহ বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এক শিক্ষার্থী আশ্রয়কেন্দ্র থেকে জানান, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারের পরিস্থিতি বেশি ভয়াবহ। টানা সাইরেন, বিস্ফোরণ এবং বিমান চলাচলের শব্দে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ নাগরিকরা চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে কাতারের Al Udeid Air Base-কে লক্ষ্য করে হামলার কথা বলা হয়েছে।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই। দোহায় বিস্ফোরণের শব্দ ও বিমান হামলার সতর্কতা সংকেত শোনা গেছে। একই সময়ে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী অবুধাবিতে একটি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরানের ভেতরে বিস্ফোরণ, খামেনিকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি
তেহরানসহ ইরানের একাধিক শহরে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে কে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। তেহরানে তার কার্যালয় ও প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদের আশপাশে ধোঁয়া দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলছে, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সুস্থ আছেন। তবে রাজধানীর বিভিন্ন অংশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং জনসাধারণের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ইন্টারনেট ‘ব্ল্যাকআউট’-এর মুখে ইরান
ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলার পর ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ মারাত্মকভাবে সীমিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো বলছে, দেশটি প্রায় পূর্ণাঙ্গ ইন্টারনেট শাটডাউনের দিকে চলে গেছে। এর ফলে দেশটির ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল, সতর্কতা জারি
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ইউরোপীয় বিমান সংস্থা Air France তেল আবিব ও বৈরুতগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে। পরবর্তী সূচি পরে জানানো হবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ বিমানের জেদ্দা, মদিনা, রিয়াদ, দাম্মাম, শারজাহ, আবুধাবি, কুয়েত ও দুবাইগামী যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল-ইরান সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর ও আরব সাগর অঞ্চলে নিরাপত্তা সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনী “সর্বশক্তি দিয়ে আগ্রাসনের জবাব দেবে।” অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, তারা প্রয়োজন হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তেজনা প্রশমনের কোনো তাৎক্ষণিক ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। বরং পাল্টাপাল্টি হামলা, আকাশ প্রতিরক্ষা তৎপরতা এবং সামরিক ঘাঁটিতে আঘাতের খবর মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও সংঘাত আরও বিস্তৃত হবে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।




