ব্রাহ্মী থেকে গৌড়ীয়, গৌড়ীয় থেকে বাংলা: বগুড়ার মাটিতে লুকিয়ে থাকা এক বিস্মৃত ইতিহাস

 

জয়ন্ত আচার্য
সাংবাদিক-গবেষক

বিশেষ গবেষণা প্রবন্ধ

ভিনিউজ : আমরা প্রতিদিন বাংলা লিখি। ‘অ’, ‘ক’, ‘ম’, ‘ব’—এই অক্ষরগুলো আমাদের কাছে এতটাই পরিচিত যে কখনো মনে হয় না, প্রতিটি অক্ষরের পেছনেও একটি দীর্ঘ ইতিহাস থাকতে পারে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়-এই অক্ষরগুলো কোথা থেকে এল? হাজার বছর আগে বাংলার মানুষ কী অক্ষরে লিখত? তারও আগে এই ভূখণ্ডে কোন লিপি প্রচলিত ছিল? আর আজকের বাংলা লিপির সঙ্গে সেই প্রাচীন অক্ষরগুলোর সম্পর্ক কোথায়? তখন হঠাৎ করেই আমাদের সামনে খুলে যায় এক বিস্ময়কর ইতিহাস।

সাম্প্রতিক সময়ে বগুড়ার বিষ্ণুপুর থেকে উদ্ধার হওয়া একটি বিষ্ণুমূর্তির গায়ে খোদাই করা গৌড়ীয় লিপি সেই বিস্মৃত ইতিহাসের দিকে নতুন করে তাকানোর সুযোগ তৈরি করেছে। মূর্তিটি বর্তমানে বগুড়া জাদুঘরে সংরক্ষিত। মূর্তির গায়ের অক্ষরগুলো যদি যথাযথভাবে পাঠোদ্ধার, কালনির্ণয় ও বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে সেটি শুধু একটি ধর্মীয় প্রত্ননিদর্শন থাকবে না; হয়ে উঠতে পারে এই অঞ্চলের ভাষা, লিপি, ধর্মীয় সংস্কৃতি, শিল্পচর্চা ও সামাজিক ইতিহাসের একটি মূল্যবান দলিল।

কিন্তু এই মূর্তির গায়ের গৌড়ীয় অক্ষর বুঝতে হলে আমাদের আরও অনেক পেছনে যেতে হবে। যেতে হবে এমন এক সময়ে, যখন ‘বাংলা’ ভাষা নামে আজকের পরিচিত ভাষার অস্তিত্বই তৈরি হয়নি, কিন্তু এই ভূখণ্ডে মানুষ বসবাস করত, প্রশাসন চলত, ধর্মীয় আচার পালিত হতো, বাণিজ্য হতো এবং মানুষ কোনো না কোনো পদ্ধতিতে নিজের কথা লিখে রাখত।

সেই দীর্ঘ যাত্রার প্রথম বড় নাম-ব্রাহ্মী।

এখানে প্রথমেই একটি ভুল ধারণা দূর করা জরুরি। ব্রাহ্মী কোনো ভাষা নয়; এটি একটি লিপি। একইভাবে সংস্কৃত একটি ভাষা, কোনো লিপির নাম নয়। প্রাচীন ভারতে সংস্কৃত ভাষা দীর্ঘকাল মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। পরে সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষা বিভিন্ন লিপিতে লেখা হয়েছে। অশোকের সময়কার ব্রাহ্মী শিলালিপির অধিকাংশই সংস্কৃতে নয়, প্রাকৃত ভাষায় লেখা হয়েছিল। ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের তথ্যও দেখায় যে অশোকের ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপির শিলালিপিগুলোর ভাষা মূলত প্রাকৃত; পরবর্তী সময়ে সংস্কৃত শিলালিপিতে প্রধান হয়ে ওঠে।

ব্রাহ্মীর উৎস কোথায়-এই প্রশ্নের উত্তর এখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়। কেউ এর সঙ্গে প্রাচীন সেমিটিক বা আরামাইক লিপির সম্ভাব্য সম্পর্ক খুঁজেছেন, কেউ ভারতীয় নিজস্ব বিকাশের কথা বলেছেন। আবার কেউ কেউ সিন্ধু সভ্যতার লিখন পদ্ধতির সঙ্গে দূরবর্তী সম্পর্কের সম্ভাবনা তুলেছেন। কিন্তু সিন্ধু লিপি এখনও নিশ্চিতভাবে পাঠোদ্ধার করা যায়নি এবং ব্রাহ্মীর উৎস নিয়েও চূড়ান্ত ঐকমত্য নেই। বাংলাপিডিয়ার ভাষ্যেও ব্রাহ্মীর উদ্ভব সম্পর্কে অনিশ্চয়তার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত-ব্রাহ্মী ভারতীয় উপমহাদেশের লিখন-ইতিহাসে এক বিশাল বাঁক তৈরি করেছিল। অশোকের শিলালিপিতে আমরা ব্রাহ্মীর একটি পরিণত রূপ দেখি। অর্থাৎ অশোকের সময়েই ব্রাহ্মীর জন্ম হয়নি; তার আগেই এই লিপি দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিণত হয়েছিল। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি অশোকের সময়ের তুলনায় কিছুটা পরবর্তী মৌর্য যুগের উন্নত রূপ নির্দেশ করে এবং এটি বাংলায় পাওয়া প্রাচীনতম ব্রাহ্মী নিদর্শন।

এখানেই বগুড়ার গুরুত্ব অসাধারণ হয়ে ওঠে।

আজ থেকে প্রায় দুই হাজার তিনশ বছর আগে যে মহাস্থান অঞ্চলে ব্রাহ্মী লিপির নিদর্শন পাওয়া গেছে, সেই বৃহত্তর বগুড়া অঞ্চলের মাটিতেই বহু শতাব্দী পরে আমরা পূর্বভারতীয় লিপির আরও বিকশিত রূপের সন্ধান পাই। মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপির ভাষা ছিল প্রাকৃত; এর মধ্যে মাগধী প্রভাবও চিহ্নিত হয়েছে। লেখাটি ছিল প্রশাসনিক প্রকৃতির অর্থাৎ লিপি শুধু ধর্মীয় বক্তব্যের জন্য ব্যবহৃত হতো না, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কাজেও ব্যবহৃত হতো।

তারপর শুরু হয় অক্ষরের দীর্ঘ বিবর্তন।

ব্রাহ্মী থেকে গুপ্ত, গুপ্ত থেকে সিদ্ধমাতৃকা ও পূর্বভারতীয় বিভিন্ন লিপিরূপ, আর সেখান থেকে গৌড়ীয় বা গৌড় লিপি। কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে এই পরিবর্তন ঘটেনি। অক্ষর মানুষের হাতের সঙ্গে বদলেছে, লেখার উপকরণের সঙ্গে বদলেছে, অঞ্চলভেদে বদলেছে এবং সময়ের সঙ্গে বদলেছে। পাথরে খোদাই করা অক্ষর, তাম্রফলকে লেখা অক্ষর, তালপাতায় লেখা অক্ষর-সব ক্ষেত্রেই লেখার ধরন ও উপকরণ অক্ষরের আকৃতিকে প্রভাবিত করেছে।

এই দীর্ঘ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হলো গৌড়ীয় লিপি। আনুমানিক নবম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে পূর্বভারতে এই লিপির ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এই লিপিধারার আঞ্চলিক রূপগুলো থেকেই বাংলা-অসমিয়া, মৈথিলি এবং ওড়িয়া লিপির পৃথক বিকাশ ঘটে।

গৌড়ীয় লিপির নামটি নিজেই আমাদের ইতিহাসের একটি দরজা খুলে দেয়। ‘গৌড়’ শুধু একটি ভূগোল নয়; প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। সপ্তম শতকে শশাঙ্কের উত্থানের সময় গৌড় একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। পরে পাল ও সেন যুগে পূর্বভারতে প্রশাসন, শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিল্প ও সাহিত্যচর্চার বিস্তার ঘটে। সেই সঙ্গে লিখিত নথির সংখ্যাও বাড়তে থাকে।

পাল যুগের তাম্রশাসন, শিলালিপি ও ধর্মীয় নিদর্শন আমাদের জানায় যে পূর্বভারতে তখন লিপিচর্চা যথেষ্ট বিকশিত ছিল। সেন যুগে এসে পূর্বভারতীয় লিপির আকৃতিতে আরও পরিবর্তন দেখা যায়। এই সময়ের বহু অক্ষর পরবর্তী বাংলা অক্ষরের সঙ্গে এমন পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি করে যে লিপিবিদরা তার বিবর্তনের ধারা অনুসরণ করতে পারেন।

অক্ষরের ইতিহাস অনেকটা মানুষের বংশপরিচয়ের মতো। একজন মানুষের সঙ্গে তার বহু প্রজন্ম আগের পূর্বপুরুষের মুখের মিল হয়তো চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু মাঝখানের প্রজন্মগুলোর ছবি পাশাপাশি রাখলে সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লিপির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। ব্রাহ্মীর একটি অক্ষরকে আধুনিক বাংলা অক্ষরের পাশে রাখলে হয়তো দুটিকে সম্পূর্ণ আলাদা মনে হবে। কিন্তু মাঝখানের গুপ্ত, সিদ্ধমাতৃকা ও গৌড়ীয় পর্যায়গুলোকে পাশাপাশি রাখলে ধীরে ধীরে সম্পর্কটি দৃশ্যমান হয়।

আজকের ‘ম’ আর প্রাচীন ব্রাহ্মীর ‘ম’ একই রকম নয়। আজকের ‘ক’ আর অশোকের ব্রাহ্মীর ‘ক’-ও একই রকম নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে। এই ধারাবাহিকতাই লিপির ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক।

এখানে আবার সংস্কৃতের প্রসঙ্গ আসে। গুপ্ত যুগে সংস্কৃত প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা অর্জন করে এবং সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে লিপির ব্যবহারেও পরিবর্তন আসে। বাংলার গুপ্তযুগের তাম্রশাসনগুলো প্রাচীন বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, গুপ্ত যুগে সংস্কৃত সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করে এবং তাম্রপত্রে ভূমিদানের নথি সংরক্ষণের প্রচলনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এখানে একটি গভীর বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে-সংস্কৃত ভাষা এবং বাংলা লিপির ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হলেও তারা একই ইতিহাস নয়। সংস্কৃত একটি ভাষা; বাংলা একটি ভাষা; ব্রাহ্মী, গৌড়ীয়, বাংলা-এগুলো লিপির ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়। সংস্কৃত ভাষা বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন লিপিতে লেখা হয়েছে। একইভাবে বাংলা ভাষাও ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন লিখন পদ্ধতির সংস্পর্শে এসেছে।

বাংলা ভাষা যে সংস্কৃতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলা শব্দভাণ্ডার, সাহিত্য, ধর্মীয় ও দার্শনিক পরিভাষায় সংস্কৃতের বিশাল প্রভাব রয়েছে। কিন্তু বাংলা ভাষাকে সরাসরি ‘সংস্কৃত থেকে তৈরি’ বলা ভাষার বিবর্তনকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে। বাংলা একটি ইন্দো-আর্য ভাষা, যার বিকাশ প্রাচীন ও মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষার দীর্ঘ পরিবর্তনের সঙ্গে পূর্বভারতের আঞ্চলিক ভাষার মিথস্ক্রিয়ার ফল।

ঠিক তেমনি বাংলা লিপিকেও ‘সংস্কৃতের অক্ষর’ বলা যায় না। বরং বাংলা লিপির শিকড় রয়েছে পূর্বভারতে ব্রাহ্মী-উৎপন্ন লিপির দীর্ঘ আঞ্চলিক বিবর্তনে। বাংলাপিডিয়া আধুনিক বাংলা লিপিকে উত্তর ভারতীয় ব্রাহ্মীর পূর্বাঞ্চলীয় ধারার দীর্ঘ বিকাশের ফল হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তারপর আসে সুলতানি যুগ। বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাষা ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে আরবি-ফারসির প্রভাব প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু বাংলা ভাষা হারিয়ে যায়নি, বাংলা লিপিও বিলীন হয়নি। মানুষের মুখের ভাষা, পুঁথি, সাহিত্য, ধর্মীয় আখ্যান, লোকসংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবন বাংলা ভাষাকে বহন করে নিয়ে গেছে। মুঘল আমলেও ফারসি প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে শক্তিশালী ছিল, কিন্তু বাংলা তার সামাজিক ভিত্তি ধরে রাখে।

এখানে ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়-রাজদরবারের ভাষা এবং মানুষের ভাষা সবসময় এক নয়।
আর সেই কারণেই বগুড়ার বিষ্ণুমূর্তির গায়ে খোদাই করা গৌড়ীয় অক্ষর এত গুরুত্বপূর্ণ। এটি যদি সঠিকভাবে পাঠোদ্ধার করা যায়, তাহলে হয়তো জানা যাবে মূর্তিটির সময়কাল, নির্মাতা, পৃষ্ঠপোষক, ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিত কিংবা সেই সময়কার ভাষা-সংস্কৃতির কিছু অজানা তথ্য। একটি ছোট্ট লেখাও কখনো কখনো একটি বিশাল ঐতিহাসিক প্রশ্নের দরজা খুলে দিতে পারে।

প্রাচীন মূর্তির গায়ের লেখা পাঠোদ্ধারের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবি, তির্যক আলো, ডিজিটাল ইমেজ বিশ্লেষণ, অক্ষরের গভীরতা ও রেখা পর্যবেক্ষণ এবং সমসাময়িক তাম্রশাসন ও শিলালিপির সঙ্গে তুলনার মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত অক্ষরের পাঠ পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হয়। তবে বগুড়ার এই নির্দিষ্ট বিষ্ণুমূর্তির লেখাটি ঠিক কোন পদ্ধতিতে উদ্ধার হয়েছে এবং এর পূর্ণ পাঠ কী—এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রত্নতাত্ত্বিক বা লিপিবিদ্যাগত প্রতিবেদন প্রকাশিত না হলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।

এখানে গবেষণার একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ বগুড়ার ইতিহাসে শুধু গৌড়ীয় লিপিই নয়, তারও বহু শতাব্দী আগে ব্রাহ্মী লিপির উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে। মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি এই ভূখণ্ডের লিখিত ইতিহাসকে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক পর্যন্ত নিয়ে যায়। অর্থাৎ বগুড়ার মাটি যেন আমাদের সামনে একটি দীর্ঘ সময়রেখা খুলে দেয়। ব্রাহ্মী → পূর্বভারতীয় লিপির বিবর্তন → গৌড়ীয় → বাংলা। এই ধারাটি শুধু অক্ষরের বিবর্তন নয়; এটি একটি ভূখণ্ডের জ্ঞানচর্চার বিবর্তন। এখন প্রশ্ন হলো,আমরা এই ইতিহাস কতটা জানি?

বাংলাদেশে ভাষা নিয়ে আলোচনা হলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই ভাষা আন্দোলনের কথা বলি। বাংলা ভাষার অধিকার, একুশে ফেব্রুয়ারি, সাহিত্য, বানান, ভাষার মর্যাদা-এসব আমাদের জাতীয় চেতনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বাংলা অক্ষরের নিজের ইতিহাস নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। নতুন প্রজন্ম জানে ‘ক’ কীভাবে লিখতে হয়; কিন্তু ‘ক’-এর পূর্বপুরুষ কোথায় ছিল-সে প্রশ্ন খুব কমই সামনে আসে।

এই জায়গাতেই ভাষাতত্ত্ব ও লিপিবিদ্যার নতুন চর্চার প্রয়োজন। একজন তরুণ যদি জানতে চায়-‘আমাদের বাংলা অক্ষর কোথা থেকে এসেছে?’ তাহলে তাকে শুধু একটি উত্তর দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাকে দেখাতে হবে অক্ষরের বিবর্তন। ব্রাহ্মীর একটি অক্ষর, তার পরবর্তী গুপ্ত রূপ, তারপর গৌড়ীয় রূপ এবং শেষে আধুনিক বাংলা রূপ পাশাপাশি দেখাতে হবে। তখন ইতিহাস বইয়ের শুকনো তথ্য জীবন্ত হয়ে উঠবে।

আর এখানেই বগুড়ার বিষ্ণুমূর্তি হয়ে উঠতে পারে একটি প্রতীক।

একটি মূর্তি আমাদের প্রশ্ন করতে শেখাতে পারে-এই অক্ষর কে লিখেছিল?

কেন লিখেছিল?

কোন ভাষায় লিখেছিল?

তার সময়কার মানুষ কোন ভাষায় কথা বলত?

কোন ভাষা ছিল রাজদরবারের?

কোন ভাষা ছিল সাধারণ মানুষের?

আর সেই অক্ষর কীভাবে কয়েকশ বছর পর বদলে গিয়ে আমাদের আজকের বাংলা অক্ষরের পূর্বপুরুষ হয়ে উঠল?

একটি প্রত্নবস্তু তখন আর শুধু জাদুঘরের কাচের বাক্সে রাখা একটি পুরোনো বস্তু থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে প্রশ্ন করার একটি মাধ্যম। আর ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান কাজ হয়তো উত্তর দেওয়া নয়-সঠিক প্রশ্ন তৈরি করা।

বগুড়ার মাটিতে পাওয়া ব্রাহ্মী নিদর্শন এবং পরবর্তী সময়ের গৌড়ীয় লিপির নিদর্শনকে যদি একই দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরম্পরায় রেখে গবেষণা করা যায়, তাহলে এই অঞ্চলকে বাংলা লিপির বিবর্তনের একটি অসাধারণ ক্ষেত্র হিসেবে নতুনভাবে দেখা সম্ভব। বিশেষ করে মহাস্থান থেকে শুরু করে পাল-সেন যুগ, পরবর্তী সুলতানি ও মুঘল যুগ এবং আধুনিক বাংলা লিপির দিকে একটি ধারাবাহিক গবেষণা করা গেলে বাংলাদেশের লিপি-ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।

আমরা যে অক্ষরে আজ আমাদের নাম লিখি, সেই অক্ষরের নিজেরও একটি নামহীন দীর্ঘ জীবন আছে। তার শৈশব ছিল ব্রাহ্মীর যুগে, কৈশোর কেটেছে গুপ্ত ও পূর্বভারতীয় নানা লিপিরূপে, যৌবনে সে গৌড়ীয় পরিচয় পেয়েছে, আর দীর্ঘ বিবর্তনের শেষে বাংলা হয়ে আজ আমাদের হাতে এসেছে।

তাই বগুড়ার বিষ্ণুমূর্তির গায়ে খোদাই করা কয়েকটি অক্ষরকে শুধু কয়েকটি পুরোনো দাগ হিসেবে দেখলে আমরা তার প্রকৃত মূল্য বুঝতে পারব না। সেগুলো হয়তো আমাদেরই অক্ষরের বহু দূরের পূর্বপুরুষের স্বাক্ষর।

আর সেই স্বাক্ষর আমাদের একটি প্রশ্ন করে-

আমরা কি শুধু বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি, নাকি যে অক্ষরে বাংলা লিখি, তার দীর্ঘ ইতিহাসকেও জানতে চাই? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা থেকেই হয়তো বাংলাদেশে ভাষাতত্ত্ব, লিপিবিদ্যা ও প্রাচীন বাংলা ইতিহাসের নতুন চর্চার শুরু হতে পারে।

চলবে…

গবেষণাধর্মী ধারাবাহিক প্রবন্ধ: প্রথম পর্ব

 

পূর্বের খবরপে স্কেলের গেজেট কবে : অপেক্ষার প্রহর গুনছে সরকারী চাকরীজীবীরা
পরবর্তি খবরএ বার সাইফ আলি খানের সঙ্গে জুটিতে দেখা যাবে কিয়ারা আডবাণীকে? কোন ছবিতে দেখা যাবে যুগলকে?
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!