বিশ্বকাপের ১০ ছবি, শিল্পের ১০ অনন্ত প্রতিধ্বনি

 

ভিনিজ প্রতিবেদক

ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের একটি খেলা নয়। এটি আবেগ, নাটক, সৌন্দর্য, বিজয়, পরাজয় এবং মানবিক অনুভূতির এক অসাধারণ ক্যানভাস। আর সেই ক্যানভাসকে অমর করে রাখেন মাঠের ফটোগ্রাফাররা। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপজুড়ে হাজার হাজার ছবি তোলা হলেও কিছু ছবি মুহূর্তের মধ্যেই ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। কারণ, এসব ছবি শুধু খেলার দৃশ্য নয়-এগুলো যেন শতাব্দী প্রাচীন শিল্পকর্মের আধুনিক পুনর্জন্ম।২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো কীভাবে ফিরে গেল টিয়েপোলো, বার্নিনি, মুঙ্ক ও কুরবের শিল্পজগতে ।

বিবিসি তাদের বিশেষ বিশ্লেষণে বিশ্বকাপের এমন ১০টি ছবি তুলে ধরেছে, যেগুলোর সঙ্গে বিশ্বের বিখ্যাত চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যের বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যেন ফুটবল মাঠে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে রেনেসাঁ, বারোক, আধুনিকতাবাদ কিংবা এক্সপ্রেশনিজমের শিল্পভাষা।

১. ইংল্যান্ড–মেক্সিকো: গতি যেন আধুনিক শিল্পের বিস্ফোরণ

রাউন্ড অব ১৬-এ ইংল্যান্ড ও মেক্সিকোর খেলায় বলের জন্য দুই দলের খেলোয়াড়দের সম্মিলিত ছুটে চলার দৃশ্যটি ছিল অসাধারণ। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন এবং মেক্সিকোর হেসুস গালিয়ার্দোকে ঘিরে তৈরি হওয়া সেই মুহূর্ত যেন সময়কে থামিয়ে দিয়েছিল।

এই ছবির সঙ্গে ইতালীয় ফিউচারিস্ট শিল্পী উমবের্তো বচ্চিওনির বিখ্যাত চিত্রকর্ম The Charge of the Lancers–এর আশ্চর্য মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই গতি, শক্তি ও সম্মিলিত আক্রমণের ছন্দ একইভাবে ধরা পড়ে।

২. ঘানা–পানামা: ফুটবল না বক্সিং?

ঘানার আর্নেস্ট নুয়ামাহ এবং পানামার সিজার ব্ল্যাকম্যানের সংঘর্ষের ছবিটি যেন ফুটবলের চেয়ে বক্সিং রিংয়ের দৃশ্য বেশি মনে করিয়ে দেয়। বলটি মাঝখানে স্থির, কিন্তু দুই শরীরের সংঘর্ষে তৈরি হয়েছে বিস্ফোরণময় নাটকীয়তা।

এই দৃশ্যের সঙ্গে জর্জ বেলোজের বিখ্যাত চিত্রকর্ম Dempsey and Firpo–এর মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে এক বক্সারের বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তকে অমর করে রাখা হয়েছে।

৩. বসনিয়া-হার্জেগোভিনার সমর্থকের আর্তনাদ

যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচে বসনিয়ার এক কিশোর সমর্থকের হতাশ মুখ পুরো বিশ্বকে স্পর্শ করেছিল। দুই হাতে মুখ চেপে ধরা, বিস্ফারিত চোখ ও নিঃশব্দ চিৎকার—এ যেন পরাজয়ের প্রতীক।

এই অভিব্যক্তি শিল্প ইতিহাসের দুটি বিখ্যাত কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়-কারাভাজ্জোর Medusa এবং এডভার্ড মুঙ্কের The Scream। মানুষের ভয়, হতাশা ও অসহায়ত্বের প্রকাশ যেন একই সুরে মিলেছে।

৪. মরক্কোর বিজয় উদ্‌যাপন আর বার্নিনির ‘ডেভিড’

নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে হারানোর পর মরক্কোর ইসমাইল সাইবারির উদ্‌যাপনের মুহূর্তটি ছিল এক জীবন্ত ভাস্কর্যের মতো। শরীরের ঘূর্ণন, হাতের ভঙ্গি এবং মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয়, যেন কোনো ভাস্কর পাথরে খোদাই করেছেন।

এটি ইতালীয় ভাস্কর জিয়ান লরেঞ্জো বার্নিনির বিখ্যাত ভাস্কর্য David-এর গতিশীলতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

৫. নরওয়ের সমর্থকদের লাল উচ্ছ্বাস

নরওয়ের সমর্থকদের ঐতিহ্যবাহী ‘রোয়িং চ্যান্ট’-এর সময় তোলা ছবিটি ছিল এক বিমূর্ত শিল্পকর্মের মতো। সারিবদ্ধ লাল পোশাক, একযোগে হাতের নড়াচড়া এবং দর্শকদের ছন্দময় উচ্ছ্বাস ছবিটিকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা।

এটি সুইস-জার্মান শিল্পী পল ক্লির বিখ্যাত Rose Garden চিত্রকর্মের রঙ, ছন্দ ও বিন্যাসের কথা মনে করিয়ে দেয়।

৬. ‘সেন্ট রোনালদো’: ফুটবলার থেকে ধর্মীয় আইকন

পর্তুগালের সমর্থকদের হাতে দেখা যায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে সাধুর বেশে আঁকা একটি বিশাল ব্যানার। মাথায় আলোর মুকুট, হাতে রাজদণ্ড, সবুজ চাদর-সব মিলিয়ে যেন কোনো গির্জার আইকনচিত্র।

এটি খ্রিস্টান ধর্মের ‘হারানো আশার পৃষ্ঠপোষক সাধু’ সেন্ট জুড থাডিয়াসের ঐতিহ্যবাহী চিত্ররীতির অনুকরণে তৈরি। ফুটবল তারকাদের ঘিরে ভক্তদের আবেগ যে প্রায় ধর্মীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তারই প্রতীক এই ছবি।

৭. দক্ষিণ আফ্রিকা–কানাডা: ফুটবল নাকি ট্যাঙ্গো?

দক্ষিণ আফ্রিকার স্পেহেলেহো সিথোলে এবং কানাডার জনাথন ডেভিড বলের জন্য লড়ছেন। কিন্তু ছবিটি থেকে বল সরিয়ে দিলে মনে হয়, যেন দুই নৃত্যশিল্পী ট্যাঙ্গো নাচছেন।

শরীরের ভারসাম্য, সংঘর্ষ এবং একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার ভঙ্গি ইতিহাসের অসংখ্য ট্যাঙ্গোচিত্রের আবহ তৈরি করে।

৮. মেসির উড়াল আর টিয়েপোলোর অলৌকিকতা

মিশরকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা শেষ ষোলো নিশ্চিত করার পর সতীর্থরা লিওনেল মেসিকে কাঁধে তুলে আকাশে ছুড়ে দেন। সেই মুহূর্তের ছবিটি বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ছবিগুলোর একটি।

শিল্পবিশ্লেষকদের মতে, এটি ইতালীয় শিল্পী জিওভান্নি বাতিস্তা টিয়েপোলোর Ascension of Christ চিত্রকর্মের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়। সেখানে যেমন খ্রিস্টের স্বর্গারোহণ দেখানো হয়েছে, তেমনি এখানে সতীর্থদের ভালোবাসা যেন মেসিকে আকাশের দিকে তুলে দিয়েছে।

৯. স্পেনের কুকুরেয়ার অটল দৃষ্টি

উরুগুয়ের বিপক্ষে লড়াইয়ের সময় স্পেনের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়ার মুখভঙ্গি ছিল একাগ্রতার অনন্য উদাহরণ। চোখের গভীর দৃষ্টি এবং মুখের দৃঢ়তা দর্শকদের দৃষ্টি কাড়ে।

এই অভিব্যক্তি ফরাসি বাস্তববাদী শিল্পী গুস্তাভ কুরবের ১৮৪৩ সালের বিখ্যাত আত্মপ্রতিকৃতির সঙ্গে মিল খুঁজে দেয়।

১০. পরাজয়ের আড়ালে ফরাসি তারকার বেদনা

স্পেনের কাছে সেমিফাইনালে হেরে যাওয়ার পর ফ্রান্সের তরুণ তারকা দেজিরে দুয়ের জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে বসে থাকার ছবিটি বিশ্বকাপের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত। টানা কাপড়ের নিচে মুখের রেখাগুলো এমনভাবে ফুটে উঠেছে, যেন এটি মার্বেল পাথরে তৈরি কোনো ভাস্কর্য।

এটি উনিশ শতকের সেই বিখ্যাত ভাস্কর্যগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে পাথরের ওপর এমন সূক্ষ্ম পর্দার আবরণ তৈরি করা হয়েছিল যে, দেখে মনে হয় সত্যিই স্বচ্ছ কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকা।

ফুটবল যখন শিল্পের ভাষা হয়ে ওঠে

বিশ্বকাপের এসব ছবি মনে করিয়ে দেয়, অসাধারণ ক্রীড়া ফটোগ্রাফি কখনো কেবল সংবাদচিত্র হয়ে থাকে না। সঠিক মুহূর্ত, নিখুঁত আলো, শরীরের ভঙ্গি এবং আবেগের বিস্ফোরণ মিলিয়ে একটি ছবি হয়ে উঠতে পারে চিরন্তন শিল্পকর্ম। তাই শতাব্দী পেরিয়ে টিয়েপোলো, বার্নিনি, মুঙ্ক কিংবা কুরবের শিল্পভাষা আজও নতুন রূপে ফিরে আসে ফুটবল মাঠে।

২০২৬ বিশ্বকাপের এই দশটি ছবি শুধু খেলার ইতিহাস নয়, শিল্পের ইতিহাসের সঙ্গেও এক অনন্য সংলাপ তৈরি করেছে। এগুলো প্রমাণ করে, মানুষের আবেগের ভাষা সময়ের সঙ্গে বদলায় না-মাধ্যম বদলায়। একসময় তা ছিল ক্যানভাস ও মার্বেলে, আজ তা ধরা পড়ে ক্যামেরার লেন্সে।

পূর্বের খবরবলিউড: বাংলা ছবি দেখেন না, তবু অভিনয়ে আগ্রহী কাজল
পরবর্তি খবরপ্রথমবারের মতো বিশ্বকাপজয়ীরা পাবেন চ্যাম্পিয়নশিপ রিং
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!