ভিনিউজ ডেস্ক
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে নজিরবিহীন এক বাণিজ্যিক পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত প্রবল বিরোধিতার মুখে ভেস্তে গেছে। বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রিসহ ফিফার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা একটি কোম্পানি গঠন এবং তার ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, তা ঘোষণার মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
ফিফার পরিকল্পনা ছিল ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস (এফএফই)’ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করা। এই সংস্থার অধীনে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ফিফা নিজে কেবল প্রশাসনিক ও নীতিগত দায়িত্ব পালন করত।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠানের ৮০ শতাংশ মালিকানা ফিফার হাতে থাকলেও বাকি ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটাল-এর কাছে বিক্রি করার কথা ছিল। এর বিনিময়ে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাওয়ার আশা করেছিল ফিফা। সেই অর্থের একটি অংশ সদস্য দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে বিতরণ করারও প্রস্তাব ছিল।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের প্রতিটি সংস্থা এককালীন প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী চার বছরে আরও প্রায় ২০ কোটি টাকা পেতে পারত। বর্তমানে যে অর্থ তারা পায়, তার তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হতো। ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট ও আর্থিকভাবে দুর্বল ফুটবল ফেডারেশনগুলোর কাছে প্রস্তাবটি বেশ আকর্ষণীয় ছিল।
তবে পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। অনেকের অভিযোগ, এটি মূলত বিশ্বকাপের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতাকে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা। সমালোচকদের মতে, এতে ফুটবলের স্বার্থের চেয়ে বাণিজ্যিক লাভই বেশি গুরুত্ব পেত এবং ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের চরিত্র বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো।
সবচেয়ে বড় আপত্তি আসে ইউরোপীয় ফুটবল মহল থেকে। উয়েফা, ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলো, বিভিন্ন ক্লাব এবং ফুটবলারদের সংগঠন এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের ফলে বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যা ও সূচি আরও বাড়তে পারে, যা খেলোয়াড়দের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে এবং প্রতিযোগিতার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের প্রভাবশালী ফুটবল শক্তিগুলো একযোগে আপত্তি জানালে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। পরে উত্তর আমেরিকার পাশাপাশি এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও ওশেনিয়ার অনেক সদস্য দেশও ধীরে ধীরে বিরোধিতার কাতারে যোগ দেয়। বিস্তৃত এই ঐকমত্যের মুখেই শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি থেকে সরে দাঁড়ায় ফিফা।
এই পরিকল্পনার আরেকটি বিতর্কিত দিক ছিল, নতুন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমান বা ভবিষ্যতের ফিফা সভাপতির দায়িত্ব পালনের সুযোগ রাখা। সমালোচকদের মতে, এতে ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও প্রভাব আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতো। যদিও ফিফা শুরু থেকেই দাবি করে এসেছে, এই উদ্যোগ কোনো ব্যক্তির সুবিধার জন্য নয়; বরং বিশ্ব ফুটবলের আয় বাড়িয়ে সদস্য দেশগুলোর উন্নয়নে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করার লক্ষ্যেই এটি নেওয়া হয়েছিল।
বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটালের প্রধান জোশুয়া কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী কুশনার পরিবারের সদস্য। তার ভাই জ্যারেড কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা। এই পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ, ক্লাব বিশ্বকাপের নতুন কাঠামো এবং বাণিজ্যিক আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ফিফা ইতোমধ্যেই রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব অর্জন করেছে। তাই আরও বেশি বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেক সদস্য দেশই সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত ফুটবলের ঐতিহ্য, প্রতিযোগিতার মর্যাদা এবং প্রশাসনিক স্বাধীনতা রক্ষার যুক্তিই প্রাধান্য পেয়েছে। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে ফিফা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছে যে, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত মতামতকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ফলে আপাতত বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা থেমে গেলেও, ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আবারও সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।




