পে স্কেলের গেজেট কবে : অপেক্ষার প্রহর গুনছে সরকারী চাকরীজীবীরা

 

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ : দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নবম জাতীয় পে স্কেলের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং সংশ্লিষ্ট সচিব কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষরও সম্পন্ন হয়েছে। এরপরও নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকর করার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতি, সরকারি অর্থের ওপর চাপ এবং বেতন-ভাতা পরিশোধের সফটওয়্যার হালনাগাদসহ বিভিন্ন কারিগরি জটিলতার কারণে এখনো গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকে নবম পে স্কেলের অগ্রগতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা, পেনশন ও গ্র্যাচুইটি খাতে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের কথা জানিয়েছিলেন। এর পর থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন স্কেল নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু জুলাই পার হয়ে আগস্ট মাসেও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় কর্মচারীদের মধ্যে অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পে স্কেলের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনেকটাই এগিয়ে গেলেও বাস্তবে এটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে সরকারি বেতন ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার নিয়ে। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা ইএফটি এবং iBAS++-এর মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। নতুন পে স্কেলে প্রথম ধাপে শুধু বর্ধিত মূল বেতন এবং পরবর্তী সময়ে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনা থাকলে বিদ্যমান সফটওয়্যারে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। বিভিন্ন গ্রেড, পদ, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা ও বকেয়া হিসাবের সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোর সমন্বয় করতে হবে। ফলে গেজেট প্রকাশের আগে সফটওয়্যার ও বেতন ব্যবস্থাপনার পুরো কাঠামো প্রস্তুত করাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নতুন পে স্কেল একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে কার্যকর করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। প্রাথমিকভাবে দুই ধাপে বাস্তবায়নের ধারণা থাকলেও বর্তমানে তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর এবং ২০২৭ সালের জুলাই থেকে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে চূড়ান্ত গেজেটে কোন পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে পর্যালোচনা কমিটির আলোচনায় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা করার একটি প্রস্তাবও সামনে আসে। যদিও এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সরকারের রাজস্ব আয়, বাজেটের ওপর চাপ এবং সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত বেতন কাঠামোর অঙ্কে পরিবর্তন আসতে পারে।

নতুন পে স্কেলে কোনো নির্দিষ্ট পেশাজীবী বা চাকরিজীবী শ্রেণি যাতে বেতন বৈষম্যের অভিযোগ না তোলে, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের পর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবীদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, এবার তা এড়াতে সরকার তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে। ফলে সচিবদের স্বাক্ষর শেষ হলেও গেজেট প্রকাশের আগে আরও কিছু প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হচ্ছে।

গেজেট প্রকাশের নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো সরকারিভাবে জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, কারিগরি জটিলতা দ্রুত সমাধান করা গেলে আগস্টের মধ্যেই গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব হতে পারে। তবে অন্য একটি সূত্র মনে করছে, iBAS++ হালনাগাদ, বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি শেষ করতে সময় লাগবে। সে ক্ষেত্রে অক্টোবরের আগে গেজেট প্রকাশ করা কঠিন হতে পারে। ফলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সচিবদের স্বাক্ষর সম্পন্ন হলেও এখন মূল প্রশ্ন—কবে প্রকাশ হবে নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট, আর কবে থেকে বাস্তবে বাড়তি বেতন পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। সেই উত্তর পেতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

পূর্বের খবরবাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ প্রস্তাব: অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা
পরবর্তি খবরব্রাহ্মী থেকে গৌড়ীয়, গৌড়ীয় থেকে বাংলা: বগুড়ার মাটিতে লুকিয়ে থাকা এক বিস্মৃত ইতিহাস
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!