পাঁচ লক্ষ তারার বিশাল সমুদ্র! নক্ষত্রপুঞ্জেই লুকিয়ে ছায়াপথের অতীত-রহস্য, দাবি বিজ্ঞানীদের

 

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ : মহাকাশের অসীম অন্ধকারে যেন ঝলমলে তারার এক বিশাল সমুদ্র। লাল, নীল ও সাদা আলোর অসংখ্য বিন্দু একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে অপার্থিব এক দৃশ্য। সম্প্রতি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা আকাশগঙ্গা ছায়াপথের প্রান্তে অবস্থিত বিখ্যাত গ্লোবিউলার ক্লাস্টার মেসিয়ার-৩ (এম৩)-এর নতুন ছবি প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এই ছবিটি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং মহাবিশ্বের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

এম৩ হলো আকাশগঙ্গার সবচেয়ে বড় ও উজ্জ্বল গ্লোবিউলার ক্লাস্টারগুলোর একটি। এতে পাঁচ লক্ষেরও বেশি নক্ষত্র মহাকর্ষীয় শক্তির মাধ্যমে একত্রে আবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। আমাদের ছায়াপথে বর্তমানে প্রায় ১৫০টি গ্লোবিউলার ক্লাস্টারের সন্ধান পাওয়া গেছে, তবে আকার, উজ্জ্বলতা এবং বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের কারণে এম৩ বিশেষভাবে গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

কী এই গ্লোবিউলার ক্লাস্টার?

মহাকাশে অসংখ্য নক্ষত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও সব নক্ষত্রপুঞ্জকে গ্লোবিউলার ক্লাস্টার বলা হয় না। গ্লোবিউলার ক্লাস্টার হলো এমন এক ধরনের গোলাকার নক্ষত্রপুঞ্জ, যেখানে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র শক্তিশালী মহাকর্ষীয় বলের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ থাকে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এসব নক্ষত্রের জন্ম প্রায় একই সময়ে, একই বিশাল গ্যাস ও ধুলিকণার মেঘ থেকে। অর্থাৎ, এরা একই উৎস থেকে সৃষ্টি হওয়ায় তাদের বয়স ও রাসায়নিক গঠনও প্রায় একই রকম। কোটি কোটি বছর ধরে তারা একসঙ্গে আকাশগঙ্গার কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এম৩?

গবেষকদের মতে, গ্লোবিউলার ক্লাস্টারগুলো ছায়াপথের অতীত ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। কারণ এগুলোর অধিকাংশ নক্ষত্র মহাবিশ্বের প্রাচীন যুগে জন্ম নিয়েছিল এবং এরপর থেকে খুব কম পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে এসব নক্ষত্র বিশ্লেষণ করে আকাশগঙ্গার সৃষ্টি, বিবর্তন এবং বয়স সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

এম৩ এই গবেষণায় আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক আরআর লাইরি (RR Lyrae) ধরনের স্পন্দনশীল নক্ষত্র। এসব তারার উজ্জ্বলতা নির্দিষ্ট সময় পরপর বাড়ে ও কমে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এগুলোকে “স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল” বা আদর্শ আলোক উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে পৃথিবী থেকে গ্লোবিউলার ক্লাস্টারের সঠিক দূরত্ব নির্ণয় করা সম্ভব হয়।

বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে এম৩-এ ২৪০টিরও বেশি আরআর লাইরি নক্ষত্র শনাক্ত করেছেন, যা মহাকাশ গবেষণায় অত্যন্ত মূল্যবান তথ্যভান্ডার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রহস্যময় ‘ব্লু স্ট্র্যাগলার’ তারার খোঁজ

এম৩-এর আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো ব্লু স্ট্র্যাগলার (Blue Straggler) নামে পরিচিত এক ধরনের বিরল নক্ষত্র। এই ক্লাস্টারে অন্তত ৭০টি ব্লু স্ট্র্যাগলার শনাক্ত করা হয়েছে।

সাধারণত গ্লোবিউলার ক্লাস্টারের অধিকাংশ নক্ষত্র অনেক পুরোনো হওয়ায় তাদের রং লালচে হয়ে যায়। কিন্তু ব্লু স্ট্র্যাগলারগুলো উজ্জ্বল নীল আলো ছড়ায় এবং তুলনামূলকভাবে অনেক নবীন বলে মনে হয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই নক্ষত্রগুলো পাশের অন্য নক্ষত্রের কাছ থেকে মহাকর্ষীয় প্রভাবে অতিরিক্ত পদার্থ বা ভর সংগ্রহ করে। ফলে এগুলোর তাপমাত্রা ও উজ্জ্বলতা বেড়ে যায় এবং নীল রঙ ধারণ করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আকাশগঙ্গার এম৩ ক্লাস্টারেই প্রথম ব্লু স্ট্র্যাগলার নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া যায়।

আকাশগঙ্গার অতীত জানার জানালা

গ্লোবিউলার ক্লাস্টারগুলো সাধারণত ছায়াপথের একেবারে কেন্দ্রে নয়, বরং কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। এদের বয়স প্রায় ১১ থেকে ১৩ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত হতে পারে, যা মহাবিশ্বের প্রাচীনতম নক্ষত্রসমষ্টির মধ্যে অন্যতম।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এসব প্রাচীন নক্ষত্রপুঞ্জ বিশ্লেষণের মাধ্যমে আকাশগঙ্গার জন্ম, বিবর্তন, রাসায়নিক পরিবর্তন এবং মহাবিশ্বের প্রাথমিক সময় সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব। সেই কারণেই এম৩ শুধু একটি মনোমুগ্ধকর নক্ষত্রপুঞ্জ নয়, বরং আমাদের ছায়াপথের সুদূর অতীতের এক জীবন্ত মহাজাগতিক দলিল।

নাসার প্রকাশিত সাম্প্রতিক ছবিটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, মহাকাশের অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছরের ইতিহাস। আর সেই ইতিহাস উন্মোচনের অন্যতম চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে পাঁচ লক্ষের বেশি নক্ষত্রে গঠিত এই বিস্ময়কর গ্লোবিউলার ক্লাস্টার এম৩।

পূর্বের খবরআবহাওয়া : সব সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল
পরবর্তি খবরজনগণের জীবনমান উন্নয়ন বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার : প্রধানমন্ত্রী 
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!