অভিক মৈত্র, কোলকাতা থেকে
বিশেষ প্রতিবেদন :
ভিনিউজ : ভারতের পশ্চিমবঙ্গ-এ ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে। ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৯ এপ্রিল, আর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে ৪ মে। রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র মধ্যে, যদিও বাম দলগুলোও নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ক্ষমতায় টানা তৃতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করতে মরিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বে দলটি উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের সাফল্য তুলে ধরে ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে চাইছে। বিশেষ করে নারী ভোটার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের শক্ত অবস্থান এখনো বড় রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে বিজেপি রাজ্যে নিজেদের প্রভাব আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছে। দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বিশেষ করে অমিত শাহ, কলকাতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করে নির্বাচনী প্রচারণা তদারকি করছেন। বিজেপি তাদের প্রচারণায় দুর্নীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের অভাবকে বড় ইস্যু হিসেবে সামনে আনছে। শহরাঞ্চল ও কিছু সীমান্তবর্তী জেলায় তাদের সমর্থন বাড়লেও গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো তারা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
বাম দলগুলো, বিশেষ করে সিপিআই(এম), একসময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তি হলেও বর্তমানে তাদের অবস্থান দুর্বল। তবুও তারা সংগঠিত কর্মীভিত্তি এবং তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার কৌশল নিয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাম ভোটের একটি অংশ ইতোমধ্যে বিজেপির দিকে সরে যাওয়ায় রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে।

এবারের নির্বাচনে টালিউড তারকারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, যা ভোটের লড়াইকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে একাধিক জনপ্রিয় মুখ মাঠে নেমেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য লাভলি মৈত্র, সায়নী ঘোষ এবং কাঞ্চন মল্লিক। এরা নিজেদের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে বিজেপিও তারকা প্রার্থী দিতে পিছিয়ে নেই। দলের হয়ে লড়ছেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, পায়েল সরকার এবং হিরণ চ্যাটার্জি। তারা রাজ্যজুড়ে প্রচারণায় অংশ নিয়ে দলীয় অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
নির্বাচনে স্থানীয় ইস্যুগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামোগত সমস্যা, বেকারত্ব, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং নাগরিক সুবিধার ঘাটতি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এসব ইস্যু বিরোধী দলগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরলেও ক্ষমতাসীন দল উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে নারী ভোটার, তরুণ প্রজন্ম এবং শহরতলির মধ্যবিত্ত শ্রেণি ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুও ভোটের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন শুধু একটি নিয়মিত নির্বাচন নয়; বরং এটি রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তৃণমূল কংগ্রেস তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি বিজেপি বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করবে-তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ফলাফল ঘোষণার দিন পর্যন্ত।




