ধূসর হয়ে যাচ্ছে গ্রিনল্যান্ডের বরফ, এক বছরে গলেছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন টন ; রংবদলে নতুন বিপদসঙ্কেত দেখছেন বিজ্ঞানীরা

 

ভিনিউজ ডেস্ক:

পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তাগুলোর একটি এখন দেখা যাচ্ছে গ্রিনল্যান্ডে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থায়ী বরফস্তরটি শুধু দ্রুত গলছেই না, বরং বরফের রংও ধীরে ধীরে সাদা থেকে ধূসর হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই রং পরিবর্তন ভবিষ্যতে বরফ গলার হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থিত গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা কয়েক কিলোমিটার পুরু বরফে আচ্ছাদিত। এই বরফস্তরে পৃথিবীর মোট মিঠাপানির প্রায় ৭ শতাংশ জমা রয়েছে। যদি পুরো বরফস্তর একদিন গলে যায়, তবে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রায় ৭ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিজ্ঞানী মহল।

সাম্প্রতিক উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে গ্রিনল্যান্ডজুড়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় বরফ গলেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন টন (১০,০০০ কোটি টন) বরফ হারিয়েছে গ্রিনল্যান্ড। শুধু ৭ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে বরফ গলার প্রভাব পড়ে বরফস্তরের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকায়, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় গলন-ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তর আটলান্টিক থেকে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু আগের তুলনায় অনেক বেশি উত্তরে প্রবেশ করছে। ফলে আগে যেখানে শুধু উপকূলীয় পাতলা বরফ গলত, এখন পুরু বরফস্তরও গলতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালে গ্রীষ্মকাল স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দীর্ঘ হওয়ায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বরফ গলার প্রবণতা অব্যাহত ছিল। সেই ধারাবাহিকতাই ২০২৫ সালে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

তবে গবেষকদের সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করেছে বরফের রং পরিবর্তন। সাম্প্রতিক উপগ্রহচিত্রে দেখা যায়, অনেক জায়গার বরফ আর আগের মতো উজ্জ্বল সাদা নেই; তা ধূসর বা কালচে হয়ে উঠছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ব্ল্যাক কার্বন (Black Carbon), ধুলাবালি, বন দাবানলের ছাই এবং শিল্প দূষণের ক্ষুদ্র কণাকে। এসব কণা বরফের ওপর জমে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করার ক্ষমতা বা অ্যালবিডো (Albedo) কমিয়ে দেয়।

সাধারণত সাদা বরফ সূর্যের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আলো মহাকাশে প্রতিফলিত করে। কিন্তু বরফ ধূসর বা কালচে হলে তা বেশি তাপ শোষণ করে। ফলে বরফ আরও দ্রুত গলে এবং নতুন করে আরও বেশি ময়লা উন্মুক্ত হয়। এভাবে একটি ‘পজিটিভ ফিডব্যাক লুপ’ তৈরি হয়, যা গলনের গতি ক্রমাগত বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO), নাসা এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-এর দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ বলছে, গত তিন দশকে গ্রিনল্যান্ডের বরফ হারানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিবছর গড়ে শত শত বিলিয়ন টন বরফ গলে সমুদ্রে মিশছে। এর ফলে শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাই বাড়ছে না, উত্তর আটলান্টিকের লবণাক্ততা ও সমুদ্রস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, নেদারল্যান্ডসসহ নিচু উপকূলীয় দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস এবং জলবায়ু উদ্বাস্তু বৃদ্ধির মতো সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রিনল্যান্ডের বরফের রং বদলে যাওয়া কেবল একটি প্রাকৃতিক পরিবর্তন নয়; এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস এবং বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া এই প্রবণতা থামানো কঠিন হবে।

পূর্বের খবরশিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ সহ তিন দফঅ দাবিতে সংসদের সামনে শিক্ষার্থীরা
পরবর্তি খবররাতের মধ্যে পরীক্ষা স্থগিতাদেশ না এলে বুধবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে শিক্ষার্থীদের লংমার্চ
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!