বিশেষ প্রতিবেদন :
ভিনিউজ : দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ভোট গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ফলাফল ঘোষণা করেন।
প্রায় ৩৫ বছর পর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল। আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের পর আগামী পাঁচ বছরের জন্য তিনি বঙ্গভবনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এর মধ্য দিয়ে তৃণমূলের রাজনীতি থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার নতুন অধ্যায় শুরু হলো তাঁর।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন বিএনপির মহাসচিব এবং সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। বিএনপির কঠিন রাজনৈতিক সময়ে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ছাত্রজীবনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ১৯৬০-এর দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি ছিলেন। এ সময় তাঁকে কারাগারেও যেতে হয়েছিল।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে দেশের বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁর মধ্যে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে যোগ দেন তিনি।
১৯৮৬ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দেওয়ার মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। দুই বছর পর ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন এবং পরে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি। তবে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছরই তিনি প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের পর বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন এবং ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
তবে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আসে ২০০৬ সালের পর। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব কারাবন্দি হওয়া, দলীয় সংকট এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপি যখন রাজনৈতিকভাবে কঠিন সময় পার করছিল, তখন দলের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
২০০৯ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে তিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে দলের মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তিনি বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দলটির আন্দোলন, মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে বিএনপিকে সংগঠিত রাখার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বাইরে অবস্থান করায় দেশের ভেতরে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মির্জা ফখরুল। এ সময়ে তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলা ও নির্যাতনেরও মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে দেয়। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার রাজনৈতিক কঠিন সময়ে দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বিএনপি যখন নেতৃত্বসংকটে ছিল, তখন মির্জা ফখরুল দেশের ভেতরে থেকে দলকে ধরে রেখেছিলেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শামছুল আলমও মির্জা ফখরুলকে সদালাপী, বিনয়ী ও পরিশ্রমী রাজনীতিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্বের সূচনা হলো। পৌর চেয়ারম্যান, শিক্ষক, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির মহাসচিব-বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্ব পেরিয়ে এবার তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। ফলে তাঁর সামনে এখন দলীয় রাজনীতির বাইরে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের নতুন পরীক্ষা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার এই উত্থান তাই একই সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




