ভিনিউজ ডেস্ক-আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান যোদ্ধারা কাবুলে প্রবেশের পর দেশটির রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে নারীদের জীবন সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জনজীবনে অংশগ্রহণ ও চলাফেরার ক্ষেত্রে একের পর এক বিধিনিষেধের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।
তালেবান ক্ষমতায় আসার পর ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়েও নারীদের পড়াশোনার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। এর ফলে একটি প্রজন্মের মেয়েদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। একই সঙ্গে নারীদের জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিভিন্ন নির্দেশও জারি করা হয়েছে।
সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ
তবে সব ধরনের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। কাবুলের দক্ষিণে একটি গ্রামে নারীদের পরিচালিত একটি জ্যাম তৈরির কর্মশালা এখনো সীমিত পরিসরে কাজ করছে। ৪৭ বছর বয়সী নাজিয়া, যিনি নয় সন্তানের মা, এই উদ্যোগ পরিচালনা করছেন। সেখানে নারীরা জ্যাম তৈরি, প্রশিক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের কাজ করছেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক নতুন নিয়মে তাদের কাজের ক্ষেত্রও আরও সীমিত হয়েছে। নারীদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে পুরুষের সহায়তা নিতে হচ্ছে। বাণিজ্য মেলায় নারীরা নিজেরা স্টলে বসে পণ্য বিক্রি বা প্রদর্শন করতে পারছেন না। তালেবানের দাবি, নারীদের হিজাব ও মাথা ঢাকার নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণেই এসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
নাজিয়ার মতো উদ্যোক্তারা মনে করেন, আফগান নারীদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি। তার মতে, তালেবানের সঙ্গে বিশ্বের আলোচনার পদ্ধতিও বদলানো দরকার।
অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট
নারীদের ওপর বিধিনিষেধের পাশাপাশি আফগানিস্তান বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মধ্যেও রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ আফগানদেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক-বেঁচে থাকার জন্য কোনো না কোনো ধরনের বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত। বিভিন্ন দেশ থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ আফগানও দেশে ফিরে এসেছেন।
এই পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানকে পুরোপুরি
আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পক্ষে খুব কম দেশই অবস্থান করছে। বরং তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং কিছু ক্ষেত্রে সমঝোতার পথ খোঁজার চেষ্টা চলছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক
তালেবান ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর এখনো ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। তবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাদের বাস্তবভিত্তিক যোগাযোগ বাড়ছে। চীন, রাশিয়া, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উজবেকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে খনি, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে চুক্তি হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়াই একমাত্র দেশ যে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের ৪০টির বেশি আফগান দূতাবাস তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে জানা গেছে।
তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, সম্পর্ক উন্নত করতে হলে কূটনৈতিক পর্যায়ে দেশগুলোর আরও কাছাকাছি আসা প্রয়োজন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশ মনে করে, তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হলেও মানবাধিকার ও নারীদের অধিকারকে আলোচনার কেন্দ্রেই রাখতে হবে।
জাতিসংঘের সংলাপের চেষ্টা
আফগানিস্তানে জাতিসংঘ গত পাঁচ বছর ধরে অনুষ্ঠিনিক ভাবে তালেবানের সঙ্গে নিয়মিত ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। বন্দিদের সঙ্গে আচরণ, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং নৈতিক বিধি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বর্তমানে ‘মোজাইক’ নামে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছয়টি মূল বিষয়কে কেন্দ্র করে আরও কাঠামোবদ্ধ আলোচনা চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে মানবাধিকার, নারীর অধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রম রয়েছে। অন্যদিকে তালেবানের দাবির মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা অর্থ ছাড় এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব।
জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের মতে, ধীরগতিতে হলেও আলোচনার মাধ্যমে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তাদের ধারণা, কোনো প্রক্রিয়া না থাকার চেয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া ভালো।
চাপ নাকি সংলাপ-কোন পথে পরিবর্তন?
তালেবানের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করা উচিত, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কঠোর চাপ ও নিষেধাজ্ঞার পক্ষে, আবার কেউ মনে করেন, আফগানিস্তানকে বিচ্ছিন্ন না করে সংলাপ চালিয়ে যাওয়াই কার্যকর পথ।
আফগান নারী অধিকারকর্মীদের একটি অংশ অবশ্য মনে করেন, এখন পর্যন্ত সংলাপের ফল খুব সীমিত। তাদের মতে, তালেবান দৃশ্যমান ও সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন না আনা পর্যন্ত আলোচনার পরিধি মানবিক সহায়তার বাইরে বেশি বাড়ানো উচিত নয়।
পাঁচ বছর পরও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
তালেবান ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পরও আফগান নারীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। নারী অধিকারকর্মী মেহবুবা সিরাজ, যিনি তালেবান ক্ষমতায় আসার পর দেশেই থেকে নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, এখন দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার পরিচালিত একটি আশ্রয়কেন্দ্রও বন্ধ হয়ে গেছে। নারীদের জন্য শিক্ষার সুযোগ পুনরায় চালুর আবেদনও তালেবান নেতৃত্ব উপেক্ষা করেছে।
তবে তালেবানের ভেতরেও কিছু কর্মকর্তা সর্বোচ্চ নেতার কঠোর নীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে মেয়েদের স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। খুব সীমিত কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মের বিকল্প ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানের চিত্র জটিল। তালেবান তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগও বাড়ছে। কিন্তু নারীদের শিক্ষা ও অধিকার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান বহাল রয়েছে। ফলে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ওপরও নির্ভর করছে-এমনটাই উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
-বিবিসি বাংলা অবলম্বনে




