ভিনিউজ ডেস্ক :
ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ড্রোনসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করায় যুক্তরাজ্যকে ‘পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়া। মস্কোর অভিযোগ, ব্রিটিশ সহায়তায় পাওয়া ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক, শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। এতে রাশিয়া-যুক্তরাজ্যের উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
লন্ডনে রুশ দূতাবাস সোমবার এক বিবৃতিতে জানায়, ইউক্রেনকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা যত গভীর হবে, দেশটিকে তত বেশি মূল্য দিতে হবে। মস্কো আরও অভিযোগ করেছে, যুক্তরাজ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেন সংকটকে আরও উত্তপ্ত করছে এবং ইউক্রেনের ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।
রাশিয়ার সাবেক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই ফেদোরভ বিবিসিকে বলেছেন, এই ‘পরিণতি’ সামরিক হামলা পর্যন্ত গড়াতে পারে। তাঁর মতে, মস্কোর কিছু সামরিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, রাশিয়া যুক্তরাজ্যের ওপর হামলা চালালেও ন্যাটো শক্তভাবে পাল্টা জবাব নাও দিতে পারে।
ইউক্রেনকে কী দিচ্ছে যুক্তরাজ্য?
ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সহযোগী যুক্তরাজ্য। চলতি বছরের এপ্রিলে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইউক্রেনের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ড্রোন প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর আওতায় অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার ড্রোন সরবরাহ শুরু হয়। এসবের মধ্যে ছিল দূরপাল্লার আক্রমণাত্মক ড্রোন, গোয়েন্দা ও নজরদারি ড্রোন, সরবরাহ কাজে ব্যবহৃত ড্রোন এবং সামুদ্রিক সক্ষমতা।
জুনে লন্ডন আরও ৭৫২ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি অর্থায়ন প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর আওতায় ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইউক্রেনকে ১ লাখ ৫০ হাজার ড্রোন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ড্রোনের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ইউক্রেনকে চ্যালেঞ্জার-২ ট্যাংক, স্টর্ম শ্যাডো দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অ্যান্টি-আর্মার ক্ষেপণাস্ত্র, কামান, সাঁজোয়া যান এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে। ইউক্রেনীয় সেনাদের প্রশিক্ষণও দিয়েছে দেশটি।
রাশিয়ায় কোথায় হামলা হচ্ছে?
ইউক্রেন সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সামরিক শিল্পকারখানা, তেল শোধনাগার, গুদাম ও সরবরাহকেন্দ্রকে বেছে নেওয়া হচ্ছে। ইউক্রেনের লক্ষ্য রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা এবং জ্বালানি আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা দাবি করেছেন, যুক্তরাজ্যের তৈরি উপাদান বা কনফিগারেশন ব্যবহার করা ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলের কামেনস্কি সামরিক শিল্প কারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা হয়েছে।
মস্কো অঞ্চলের গভর্নরের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক এক হামলায় ইউক্রেন ৮২২টি ড্রোন ব্যবহার করে। এতে সাতজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এর আগে মস্কোর মেয়র জানিয়েছিলেন, রাজধানীমুখী ৬৩৭টি ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১৯৭টি রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করে।
‘পরিণতি’ বলতে কী বোঝাচ্ছে রাশিয়া?
রাশিয়া এখনো স্পষ্ট করে বলেনি, যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মস্কো ব্রিটিশ সামরিক বা গোয়েন্দা স্বার্থে বিদেশে হামলা, সাইবার হামলা কিংবা অন্যান্য ‘হাইব্রিড’ তৎপরতা বাড়াতে পারে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—রাশিয়া কি সরাসরি যুক্তরাজ্যের ভূখণ্ডে হামলার ঝুঁকি নেবে? কারণ যুক্তরাজ্য ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, কোনো সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে জোটের সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অন্যদিকে আর্টিকেল ৪ কোনো সদস্যের নিরাপত্তা বা ভূখণ্ডের অখণ্ডতা হুমকির মুখে পড়লে মিত্রদের মধ্যে পরামর্শের সুযোগ দেয়, তবে এটি সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া বাধ্যতামূলক করে না।
ব্রিটিশ সরকার অবশ্য মস্কোর হুঁশিয়ারিতে পিছু হটার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, ইউক্রেনকে সমর্থন করা ব্রিটেনের নীতির অংশ এবং সেই অবস্থান অব্যাহত থাকবে।
ফলে রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা এখনো সীমিত হলেও, ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলা এবং পশ্চিমা সামরিক সহায়তা যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।




