ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘বানানো গল্প’ বললেন মেলোনি : সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন

ভিনিউজ ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ নতুন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই নেতার মধ্যে যে বিরোধ সামনে এসেছে, তা শুধু ব্যক্তিগত মতবিরোধ নয়; বরং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতারও প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি ইতালির একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, জি-৭ সম্মেলনে তার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য মেলোনি নাকি অনুরোধ করেছিলেন। ট্রাম্প বলেন, “সে আমার সঙ্গে ছবি তুলতে চেয়েছিল। তার জন্য আমার মায়া হয়েছিল।” তিনি আরও মন্তব্য করেন, “সম্ভবত সে খুশি যে আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি।”

তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ‘বানানো গল্প’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মেলোনি বলেন, তিনি এই মন্তব্যে “বিস্ময়ে স্তব্ধ” হয়ে গেছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মিত্র দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে এমন আচরণ করেন।

মেলোনি আরও বলেন, “আমি কিংবা ইতালি কখনও কারও কাছে ভিক্ষা বা অনুনয়-বিনয় করার অবস্থানে নেই।” তার এই বক্তব্য ইতালির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে।

গত সপ্তাহে ফ্রান্সের এভিয়াঁ-লে-বাঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্প ও মেলোনিকে একাধিকবার একসঙ্গে দেখা যায়। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দুই নেতাকে ঘনিষ্ঠ আলোচনায় অংশ নিতে দেখা গেছে। সম্মেলন শেষে মেলোনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাদের সম্পর্কের মধ্যে কোনো তিক্ততা নেই এবং পারস্পরিক যোগাযোগ স্বাভাবিক রয়েছে।

কিন্তু ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ঘটনার পর ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি আগামী সপ্তাহে নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেছেন বলে জানা গেছে। যদিও সফর বাতিলের আনুষ্ঠানিক কারণ প্রকাশ করা হয়নি, তবুও পর্যবেক্ষকদের মতে এটি দুই দেশের মধ্যে সৃষ্ট অস্বস্তিরই একটি ইঙ্গিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধের পেছনে মূল কারণ ইরান ইস্যু। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর থেকেই মেলোনি প্রকাশ্যে সেই নীতির বিরোধিতা করে আসছেন। একসময় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় মিত্র হিসেবে পরিচিত মেলোনি এখন বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন।

এপ্রিল মাসে ট্রাম্প ইতালির একটি দৈনিক পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি ভেবেছিলাম মেলোনির সাহস আছে, কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।” ওই মন্তব্যে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ইরান প্রসঙ্গে ইতালির প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আরও দৃঢ় সমর্থন আশা করেছিলেন।

এদিকে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লা ফোন করে মেলোনির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। দেশটির প্রায় সব রাজনৈতিক দলও প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছে।

বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেটর ফিলিপ্পো সেনসি বলেন, “কোনো ব্যক্তিরই ইতালির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় কথা বলার অধিকার নেই।” সাবেক প্রধানমন্ত্রী গিউসেপ্পে কন্তেও ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, “ইতালি এমন অপমানের যোগ্য নয়।”

মেলোনির দল ব্রাদার্স অব ইতালির সিনেট নেতা লুচিও মালান বলেন, জি-৭ সম্মেলনের ভিডিও ফুটেজে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা ট্রাম্পের দাবির সঙ্গে মোটেও মেলে না। তার মতে, ওয়াশিংটনকে প্রয়োজন হলে ‘না’ বলার ক্ষেত্রে মেলোনির দৃঢ় অবস্থানই হয়তো ট্রাম্পকে বিরক্ত করেছে।

অন্যদিকে সরকারি জোটের শরিক ও লিগ পার্টির নেতা মাত্তেও সালভিনি বলেন, “যে জর্জিয়াকে আক্রমণ করে, সে ইতালির সবাইকেই আক্রমণ করে।”

পর্যবেক্ষকদের মতে, মেলোনি-ট্রাম্প বিরোধ বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ। একসময় ইউরোপের বহু নেতা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান নিতেন। কিন্তু বর্তমানে ইউরোপীয় নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরোধিতা করতে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছেন।

বিশেষ করে ইরান সংকট, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা প্রশ্নে মতপার্থক্যের কারণে ইউরোপে কৌশলগত স্বনির্ভরতা নিয়ে আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে। অনেক ইউরোপীয় দেশ এখন নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের ভোটারদের মনোভাবেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও ট্রাম্পপন্থী অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মেলোনি ও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই বিরোধ সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পূর্বের খবরপরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংক থেকে ছাগল উদ্ধার করতে
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!