ভিনিউজ ডেস্ক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখনো প্রশমিত হয়নি। গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে উভয় পক্ষই সরাসরি বড় ধরনের সংঘাতে না জড়ালেও সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে, তবে এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
মার্কিন বাহিনীর শক্তিশালী নৌ ও বিমান সক্ষমতা এখনো ইরানের আঘাতের পরিসরের মধ্যে অবস্থান করছে। অন্যদিকে ইরানও যুদ্ধবিরতির সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সামরিক শক্তি পুনর্গঠন ও ক্ষয়ক্ষতি মেরামতের চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে এবং সামান্য ভুল হিসাব বা ভুল বোঝাবুঝি থেকেও বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটন সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে ইরান আলোচনায় কিছু ছাড় দেয়। তবে ইরানও বারবার জানিয়ে দিচ্ছে যে তারা কোনোভাবেই পিছু হটবে না। প্রয়োজনে তারা মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালাতে সক্ষম বলে সতর্ক করেছে।
বর্তমান আলোচনার প্রধান লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার রূপরেখা নির্ধারণে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা। কিন্তু এই পর্যায়ে পৌঁছানোও সহজ হচ্ছে না। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা কোনো মূল্য ছাড়া এগোবে না। নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা বা জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার মতো পদক্ষেপকে তারা আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে অল্প কিছু জাহাজ চলাচল করলেও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে সীমিত পরিমাণ জ্বালানি রপ্তানি করতে পারলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠিন রাজনৈতিক চাপে পড়েছেন। যুদ্ধ শুরুর সময় তিনি এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধারণা করেছিলেন যে ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে দ্রুত ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং ইরান দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলে যুদ্ধের গতি পরিবর্তন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যুদ্ধ পুনরায় তীব্র হলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরানকে যে ধরনের ছাড় দিতে হতে পারে, তা রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থী অংশের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্ব বিশ্বাস করে যে তারা তাদের শাসনব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। ফলে অতিরিক্ত সামরিক হামলা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে-এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও এই সংঘাতের দ্রুত অবসান চায়। কাতার সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করলেও উভয় দেশই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে আগ্রহী।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা সম্পর্কে ভুল হিসাব করেছিলেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও টিকে থাকা এই শাসনব্যবস্থা সহজে ভেঙে পড়বে না। ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সেই ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বের ওপর।
-বিবিসি




