৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ দখল করল ইসরায়েল, বাড়ছে লেবানন সংঘাত

 

ভিনিউজ ডেস্ক : দক্ষিন লেবাননের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিউফোর্ট দুর্গ দখল করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। প্রায় ৯০০ বছর পুরোনো এই ঐতিহাসিক দুর্গটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে একটি ‘নির্ধারক পরিবর্তন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এই অভিযান এমন সময়ে পরিচালিত হলো, যখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লিতানি নদীর মূল সীমারেখা অতিক্রম করে লেবাননের আরও গভীরে অগ্রসর হচ্ছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, হেজবুল্লাহর সদস্য, স্থাপনা বা সামরিক সরঞ্জামের কাছাকাছি অবস্থান করা যে কেউ নিজের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘যৌথ শাস্তি’ এবং ‘পোড়ামাটি নীতি’ অনুসরণের অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির সৃষ্টি করছে।

ইসরায়েলের এই অগ্রযাত্রা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি প্রকাশ্যে এ অভিযানের সমালোচনা করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও অবকাঠামো ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি উভয় পক্ষকে সংঘাত বন্ধ করে কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও দক্ষিণ লেবাননে চলমান বৃহৎ সামরিক অভিযানের কোনো যৌক্তিকতা দেখছেন না বলে মন্তব্য করেছেন। ফ্রান্স এ বিষয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের অনুরোধ জানিয়েছে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুলও পরিস্থিতিকে ‘গুরুতর উদ্বেগের কারণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিউফোর্ট দুর্গটি ক্রুসেডাররা প্রায় ৯০০ বছর আগে নির্মাণ করেছিল। লিতানি উপত্যকার ওপর অবস্থিত এই দুর্গটি দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ লেবাননের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ইসরায়েল সীমান্ত থেকে মাত্র ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দুর্গটি ১৯৮২ সালের প্রথম লেবানন যুদ্ধের সময়ও ইসরায়েলি বাহিনী দখল করেছিল। তবে ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময় তারা দুর্গটি ছেড়ে যায়।

দুর্গ দখলের পর দেওয়া এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল এখন সব ফ্রন্টে—সিরিয়া, গাজা ও লেবাননে—সক্রিয়ভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। তার ভাষায়, হেজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোর ওপর দখল আরও শক্তিশালী ও সম্প্রসারণ করাই তাদের লক্ষ্য।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও এ বিজয়কে প্রতীকী ও কৌশলগত সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, ১৯৮২ সালে যে গোলানি ব্রিগেড দুর্গটি দখল করেছিল, তারাই আবার সেখানে ইসরায়েলি পতাকা উত্তোলন করেছে।

এদিকে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। ইসরায়েল বলছে, হেজবুল্লাহ সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি সেনা অবস্থান ও সীমান্তবর্তী জনবসতিগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে। এর জবাবেই তারা অভিযান জোরদার করেছে। অন্যদিকে হেজবুল্লাহ ও লেবাননের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ইসরায়েলই যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

রোববার দক্ষিণ লেবাননের টায়ার অঞ্চলে হিরাম হাসপাতালের কাছে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১৩ জন হাসপাতাল কর্মী আহত হয়েছেন। হামলায় হাসপাতালটিরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

উভয় পক্ষ পরস্পরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করায় চুক্তিটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তবে চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এই আলোচনায় হেজবুল্লাহ অংশ নিচ্ছে না।

চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে লেবাননে তিন হাজার তিনশোর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনীরও বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হয়েছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।

পূর্বের খবরপদত্যাগপত্রে যা লিখলেন দীপেন দেওয়ান
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!