ভিনিউজ : ক্যানসার চিকিৎসায় যুক্ত হচ্ছে এক নতুন সম্ভাবনাময় পদ্ধতি—যেখানে আগুন বা তাপ নয়, বরং চরম শীতলতা ব্যবহার করে ধ্বংস করা হচ্ছে ক্যানসার কোষ। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে ‘ক্রায়োঅ্যাবলেশন থেরাপি’, যা ক্রায়োথেরাপিরই একটি উন্নত ও নির্দিষ্ট প্রয়োগ।
গবেষকদের মতে, এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে ক্যানসার কোষকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় জমিয়ে বরফে পরিণত করা হয়, ফলে কোষের গঠন ভেঙে যায় এবং তা নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়। বিশেষ করে কিডনি, লিভার, ফুসফুস, স্তন এবং হাড়ের ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির প্রয়োগ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রচলিত কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপিতে যেখানে সুস্থ কোষও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, সেখানে ক্রায়োঅ্যাবলেশনের বড় সুবিধা হলো এটি তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট স্থানে কাজ করে। ফলে পার্শ্ববর্তী সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি অনেকটাই কমে আসে।
এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে আলট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে টিউমারের সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এরপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি সুচ টিউমারের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। সেই সুচের মাধ্যমে তরল নাইট্রোজেন, আর্গন বা হিলিয়াম গ্যাস প্রবেশ করানো হয়, যার তাপমাত্রা হিমাঙ্কের চেয়েও প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম।
এই চরম শীতলতায় টিউমারের ভেতরে বরফের স্ফটিক তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, এই স্ফটিকগুলো কোষের ভেতর ও বাইরের গঠনকে ভেঙে দেয় এবং এক ধরনের বাধা সৃষ্টি করে, যার ফলে কোষে রক্ত ও পুষ্টি উপাদান পৌঁছাতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে ক্যানসার কোষগুলো দুর্বল হয়ে মারা যায়।
আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের Johns Hopkins University, Stanford University এবং Harvard University-এর মতো শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। উন্নত দেশগুলোতে ইতোমধ্যেই সীমিত পরিসরে রোগীদের ওপর এই চিকিৎসা প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতিকে অনেকে ‘ফ্রিজ থেরাপি’ নামেও অভিহিত করেন। যদিও এটি এখনো সব ধরনের ক্যানসারের জন্য সম্পূর্ণ সমাধান নয়, তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর ফল দিচ্ছে বলে দাবি গবেষকদের।
চিকিৎসকরা আরও জানান, এই থেরাপির বড় সুবিধা হলো এটি ন্যূনতম কাটাছেঁড়া বা অস্ত্রোপচার ছাড়াই করা সম্ভব। ফলে রোগীর শরীরে ব্যথা, রক্তক্ষরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখনো সম্পূর্ণভাবে সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতির বিকল্প হয়ে ওঠেনি। রোগীর শারীরিক অবস্থা, ক্যানসারের ধরণ ও অবস্থান বিবেচনা করে চিকিৎসকরা এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেন।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশেও ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তি পরিচিতি পাচ্ছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ক্রায়োঅ্যাবলেশন ক্যানসার চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে, যদি এর কার্যকারিতা আরও বিস্তৃত গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন নতুন প্রযুক্তির মধ্যে এটি একটি আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষকদের বিশ্বাস, শীতলতার মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংসের এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে অনেক রোগীর জন্য জীবনরক্ষাকারী বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।




