জয়ন্ত আচার্য
সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক
ভিনিউজ : একটি মশার কামড়। এত ছোট একটি ঘটনা। অথচ সেই কামড়ই কখনো কখনো একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ, একজন মায়ের বুকের আশ্রয় কিংবা একজন বাবার সংসারের অবলম্বন কেড়ে নেয়। প্রশ্ন হলো-একটি মশার কামড়ে মানুষ মারা যাবে, আর রাষ্ট্র ও নগর ব্যবস্থাপনা শুধু বলবে, ‘ডেঙ্গু বেড়েছে’? নাকি প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে আমাদের পরিকল্পনাহীনতা, অব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত মশকনিধন এবং দীর্ঘদিনের অবহেলারও দায় আছে?
বাংলাদেশে চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও নয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন-চলতি বছরে এক দিনে মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির উভয় ক্ষেত্রেই এটি সর্বোচ্চ। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৫ হাজার ৪৭৫ জন এবং মারা গেছেন ১৩০ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩ হাজার ২১৮ জন।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টি বোঝা যাবে একটু পেছনে তাকালে। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ। ২০২২ সালে ২৮১ জন, ২০২৩ সালে রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ জন, ২০২৪ সালে ৫৭৫ জন, ২০২৫ সালে ৪১৩ জন এবং ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩০ জন মারা গেছেন। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে মৃত্যু ৩ হাজার ১০৪ জন। ২০২৩ সালের ভয়াবহতা ছিল নজিরবিহীন; ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়।

এই পরিসংখ্যানকে শুধু একটি রোগের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নগর ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতিরও একটি আয়না। কারণ ডেঙ্গু হঠাৎ করে আকাশ থেকে নেমে আসে না। এডিস মশা কোথায় জন্ম নেয়, কীভাবে বংশবিস্তার করে এবং কোন পরিবেশে তার বিস্তার দ্রুত হয়-এসব আমরা বহু বছর ধরেই জানি। তারপরও প্রতিবছর বর্ষা এলে ডেঙ্গু বাড়ে, হাসপাতাল ভর্তি হয়, মশকনিধন অভিযান শুরু হয়, সভা-সেমিনার হয়, নাগরিকদের সতর্ক করা হয়। কিন্তু কয়েক মাস পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই আমরা আবার ভুলে যাই। পরের বর্ষায় আবার একই গল্প, একই আতঙ্ক, একই মৃত্যু। প্রশ্ন হলো, আমরা কি ডেঙ্গুকে প্রতিরোধ করতে চাই, নাকি শুধু ডেঙ্গু বাড়লে তা মোকাবিলা করতে চাই?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হয় কয়েকশ বছর আগের ঢাকার দিকে। আজকের ব্যস্ত, যানজটপূর্ণ, কংক্রিটে ঢাকা মহানগরী একসময় ছিল নদী, খাল, জলাভূমি ও সবুজে ঘেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। মুঘল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ১৬০৮ সালে বাংলার সুবেদার হয়ে আসার পর প্রশাসনিক ও সামরিক কৌশলগত কারণে ঢাকাকে রাজধানী হিসেবে বেছে নেন। ১৬১০ সালে ঢাকাকে রাজধানী করে এর নাম দেন জাহাঙ্গীরনগর। নদীপথ, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও পূর্ববঙ্গের ওপর নিয়ন্ত্রণ-সবকিছু বিবেচনায় ঢাকা তখন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নগর।
চার শতাব্দীরও বেশি সময় পর সেই ঢাকার দিকে তাকালে ইতিহাসের এক নির্মম বৈপরীত্য চোখে পড়ে। যে নদী ও জলভূমি একসময় ঢাকার শক্তি ছিল, আজ সেই জলব্যবস্থার বড় অংশ দখল, ভরাট, দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের চাপে বিপন্ন। যে শহর নদী ও জলপথকে কেন্দ্র করে বেড়ে উঠেছিল, সেই শহর আজ সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার শিকার হয়। যেখানে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত, সেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে; আর জমে থাকা পানির সঙ্গে যুক্ত হয় মশার প্রজনন। ফলে জলাবদ্ধতা শুধু যানজট বা দুর্ভোগের কারণ নয়-এটি জনস্বাস্থ্যেরও ঝুঁকি।

ইসলাম খানের ঢাকা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে গড়ে ওঠেনি; বরং প্রকৃতির সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছিল। আর আধুনিক ঢাকা যেন প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই নিজের বিস্তার ঘটিয়েছে। খাল সংকুচিত হয়েছে, জলাভূমি হারিয়েছে, অপরিকল্পিতভাবে ভবন উঠেছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনেক জায়গায় দুর্বল, নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকে, পরিত্যক্ত পাত্র ও প্লাস্টিকের সামগ্রী পড়ে থাকে-আর এসবই এডিস মশার জন্য তৈরি করে দেয় প্রজননের সুযোগ।
তাই ডেঙ্গু কেবল মশার সমস্যা নয়; ডেঙ্গু এখন নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যাও। একটি শহরে যদি প্রতিদিন নতুন নতুন প্রজননস্থল তৈরি হয়, তাহলে শুধু মশার ওষুধ ছিটিয়ে এই যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়। মশা মারার চেয়ে মশার জন্মস্থান ধ্বংস করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমাদের অনেক অভিযান এখনো দৃশ্যমানভাবে ওষুধ ছিটানো এবং ফগিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। একটি জায়গায় ফগিং করা হলো, কিন্তু পাশের নির্মাণাধীন ভবনের নিচে জমে থাকা পানি রয়ে গেল; একটি সড়কে অভিযান হলো, কিন্তু বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি রয়ে গেল-তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ হবে কীভাবে?
সিটি করপোরেশনগুলোর দায়িত্ব এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু যখন বাড়ে তখন অভিযান চালানোর বদলে সারা বছর মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত লার্ভা জরিপ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন, জলাবদ্ধ স্থান শনাক্তকরণ এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোন এলাকায় কতজন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে, কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় পানি জমছে-এসব তথ্য একত্র করে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপের ওপর আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্বাস্থ্য নির্দেশনাতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের দায়িত্বও কম নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, হাসপাতাল এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে হবে। রোগী বাড়ার পর হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন রোগী যাতে ভয়াবহ হারে না বাড়ে সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ডেঙ্গু আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ ও সময়মতো হাসপাতালে নেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পূর্ববর্তী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর একটি বড় অংশ হাসপাতালে ভর্তির পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটে; ২০২৩ সালের গবেষণাতেও দেখা যায়, ১ হাজার ৭০৫ মৃত্যুর ৬৭ শতাংশের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তির এক দিনের মধ্যেই মারা গিয়েছিলেন।
অর্থাৎ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দেরি করার সুযোগ নেই। জ্বরকে সাধারণ জ্বর ভেবে দিনের পর দিন ঘরে পড়ে থাকা, নিজের মতো ওষুধ খাওয়া কিংবা গুরুতর লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। নাগরিকদেরও তাই সচেতন হতে হবে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র, পুরোনো টায়ার, নির্মাণসামগ্রী কিংবা পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাড়ির ভেতর ও আশপাশ পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ সিটি করপোরেশন যত বড় অভিযানই চালাক, একটি বাড়ির আঙিনায় বা ছাদে তৈরি হওয়া একটি ছোট প্রজননস্থলও পুরো পরিবারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে নাগরিক সচেতনতার কথা বলে প্রশাসনের ব্যর্থতা আড়াল করার সুযোগ নেই। একজন নাগরিক তার নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখতে পারেন, কিন্তু একটি শহরের হাজার হাজার নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন, নালা, খাল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এগুলো রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব। তাই ডেঙ্গুতে একজন মানুষের মৃত্যু হলে সেটিকে শুধু ‘রোগীর অসচেতনতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেমন অন্যায়, তেমনি পুরো দায় সিটি করপোরেশনের ওপর চাপিয়ে নাগরিকদের দায়িত্বহীন থাকাও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রশ্নটি তাই আরও গভীর-প্রতি বছর শত শত মানুষের মৃত্যুর দায়ভার কার? মশার তো কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব নেই। মশা তার স্বাভাবিক জীবনচক্র অনুসরণ করে। কিন্তু মানুষের তৈরি নগরে যদি মশার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়, সেই পরিবেশ সম্পর্কে প্রশাসন জানার পরও যদি ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। একই সঙ্গে মানুষ যদি নিজের চারপাশে পানি জমিয়ে রাখে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে উদাসীন থাকে এবং অসুস্থ হওয়ার পরও চিকিৎসা নিতে দেরি করে, সেই দায়ও নাগরিকের।
ঢাকার বর্তমান বাস্তবতা আমাদের আরও বড় একটি সংকেত দিচ্ছে। এই শহরের সমস্যা শুধু ডেঙ্গু নয়। জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, খাল-জলাশয় হারিয়ে যাওয়া, অপরিকল্পিত নির্মাণ, যানজট এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর বাড়তে থাকা চাপ-সবকিছু মিলে ঢাকা ক্রমেই বসবাসের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। ডেঙ্গু যেন সেই বৃহত্তর সংকটের একটি দৃশ্যমান লক্ষণ মাত্র।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ডেঙ্গু আর শুধু ঢাকার রোগ নয়; এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তারও ছিল ব্যাপক, যা প্রমাণ করে রোগটি এখন জাতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ফলে শুধু ঢাকা শহরে কিছু অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমাধান সম্ভব নয়। জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়েও একই ধরনের সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
চারশ বছরেরও বেশি আগে ইসলাম খান যে ঢাকা গড়ে তুলেছিলেন, সেই ঢাকা তার ভূপ্রকৃতি, নদী ও যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিকশিত হয়েছিল। আজকের ঢাকা সেই প্রাকৃতিক কাঠামোকে অনেকাংশে উপেক্ষা করে বেড়ে উঠেছে। তাই ডেঙ্গু আমাদের সামনে শুধু একটি রোগের প্রশ্ন রাখছে না; এটি প্রশ্ন করছে আমাদের উন্নয়নের মডেল নিয়ে। আমরা কি এমন একটি শহর তৈরি করেছি, যেখানে উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের নিরাপত্তার সম্পর্কটি ভুলে গেছি?
একটি আধুনিক রাজধানী শুধু উঁচু ভবন, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, প্রশস্ত সড়ক কিংবা ঝকঝকে স্থাপনার নাম নয়। আধুনিক রাজধানী হলো এমন একটি শহর যেখানে নিরাপদ পানি আছে, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আছে, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে, খাল ও জলাশয় রক্ষা করা হয়, মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং একটি মশার কামড় একজন মানুষের জন্য মৃত্যুঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায় না।
গত পাঁচ বছরে ৩ হাজার ১০৪টি মৃত্যু তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ২০২৩ সালের ১ হাজার ৭০৫ মৃত্যু ছিল একটি ভয়াবহ ঘণ্টাধ্বনি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মৃত্যু কিছুটা কমলেও সংকট শেষ হয়নি। আর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেই যখন এক দিনে নয়জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৫৭১ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রেকর্ড তৈরি হয়, তখন স্পষ্ট—আমরা এখনো ডেঙ্গুকে পরাজিত করতে পারিনি।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাই শুধু মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়। এটি একটি বাসযোগ্য ঢাকা ফিরে পাওয়ার যুদ্ধ। এটি খাল ফিরিয়ে আনার যুদ্ধ, জলাবদ্ধতা কমানোর যুদ্ধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক করার যুদ্ধ, নগর পরিকল্পনায় প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনার যুদ্ধ এবং সর্বোপরি প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার যুদ্ধ।
একটি মশার কামড় হয়তো ক্ষুদ্র ঘটনা; কিন্তু সেই কামড়ে একজন মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই ক্ষুদ্র বিষয় নয়। সেই মৃত্যু যদি প্রতিরোধযোগ্য হয়, তবে প্রতিটি মৃত্যু আমাদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যায়-আমরা কি সত্যিই একটি আধুনিক রাজধানী তৈরি করছি, নাকি শুধু একটি বড় শহর তৈরি করছি?
ডেঙ্গুর প্রতিটি মৃত্যু তাই শুধু শোকের পরিসংখ্যান নয়-এটি একটি অভিযোগপত্র। সেই অভিযোগপত্রে রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন আছে, সিটি করপোরেশনের কাছে প্রশ্ন আছে, নগর পরিকল্পনাবিদদের কাছে প্রশ্ন আছে, চিকিৎসাব্যবস্থার কাছে প্রশ্ন আছে এবং আমাদের প্রত্যেক নাগরিকের কাছেও প্রশ্ন আছে।
এখন আর মৌসুমি অভিযান দিয়ে হবে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে হবে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর-সারা বছর। মশা জন্মানোর আগেই তার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে। রোগী বাড়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে হবে। হাসপাতাল ভরে যাওয়ার আগেই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রস্তুত করতে হবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-ঢাকাকে এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে প্রকৃতি ও নগরায়ণ পরস্পরের শত্রু না হয়ে ওঠে।
কারণ ইসলাম খানের চারশ বছরের পুরোনো ঢাকা আমাদের একটি শিক্ষা দিয়ে গেছে-একটি শহর টিকে থাকে শুধু ইট-পাথরে নয়; টিকে থাকে তার নদী, পানি, পরিবেশ, পরিকল্পনা এবং মানুষের জীবন রক্ষার সক্ষমতায়। সেই শিক্ষা আমরা ভুলে গেলে ডেঙ্গু শুধু একটি রোগ হিসেবে নয়, আমাদের নগরসভ্যতার ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবেই থেকে যাবে।




