ভিনিউজ ডেস্ক :
দীর্ঘ দুই দশকের বর্ণিল আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায়ের ইতি টানলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিয়োনেল মেসি। সোমবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালই তাঁর শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল। অবসরের ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তিন পাতার আবেগঘন বার্তায় মেসি জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি তাঁর জন্য কষ্টের হলেও এখন সময় এসেছে সরে দাঁড়ানোর।
মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের গুঞ্জন অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বয়স ও শারীরিক অবস্থার কারণে জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। আগস্টের শুরুতেও আন্তর্জাতিক ফুটবল চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি যে এত দ্রুত আসবে, তা অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত।
মেসি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের পরের দিনই তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নিজের সঙ্গে আলোচনা ও চিন্তাভাবনা করেছেন। সবকিছু বিবেচনা করেই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি প্রকাশ্যে আনার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি।
অবসরের বার্তায় মেসি লিখেছেন, তিনি উপলব্ধি করেছেন যে বিদায়ের সময় এসে গেছে। জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্ত তাঁকে কষ্ট দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তাঁর বিশ্বাস, এটাই সঠিক সময়। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি জাতীয় দলের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল নানা উত্থান-পতনে ভরা। শুরুতে তাঁকে ঘিরে ছিল প্রত্যাশার পাহাড়, পরে এসেছিল একের পর এক হতাশা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দীর্ঘ সময় ট্রফিশূন্য থাকার কারণে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই হতাশার অধ্যায় পেছনে ফেলে আর্জেন্টিনাকে একের পর এক সাফল্য এনে দেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর শেষ কয়েকটি বছর হয়ে ওঠে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গৌরবময় সময়গুলোর একটি।
নিজের বিদায়ী বার্তায় সেই পথচলার কথাও স্মরণ করেছেন মেসি। তিনি জানিয়েছেন, শুধু সাফল্যের সময় নয়, তার আগেও জাতীয় দলের জার্সির জন্য তিনি সব সময় লড়াই করেছেন। আর্জেন্টিনার মানুষকে ফুটবলের মাধ্যমে আনন্দ দেওয়া এবং একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে তাঁদের গর্বিত করাই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
মেসির বার্তায় সবচেয়ে বেশি আবেগ ফুটে উঠেছে ফুটবল জীবনের শেষ অধ্যায় নিয়ে। তিনি লিখেছেন, তাঁর ফুটবলজীবনের বেশি সময় আর বাকি নেই এবং একে একে অধ্যায়গুলো শেষ হয়ে আসছে। জাতীয় দলের অধ্যায়টি তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে। কারণ জাতীয় দলের সঙ্গে থাকা তিনি ভালোবাসেন এবং সব সময় ভালোবেসে যাবেন। তবে তাঁর উপলব্ধি, এখন তাঁর আর দেওয়ার মতো কিছু নেই।
জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী মেসি। তাঁর মতে, আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার যোগ্য একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলার উঠে আসছেন। তাঁদের হাতেই এখন জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ। তাই নিজের জায়গা তরুণদের জন্য ছেড়ে দেওয়ার সময় এসেছে বলেই মনে করছেন তিনি।
বিদায়ী বার্তায় ভক্তদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে প্রায় ২০ বছর ধরে পাওয়া ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য আর্জেন্টিনার মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে স্বীকার করেছেন, মাঠে দাঁড়িয়ে আর সমর্থকদের সেই ভালোবাসা অনুভব করতে পারবেন না-এই অভাব তিনি অনুভব করবেন।
তবে জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না। মেসি জানিয়েছেন, এখন থেকে তিনি মাঠের বাইরে থেকে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করবেন। দলের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা-দুই সময়েই তিনি পাশে থাকবেন। অর্থাৎ জাতীয় দলের জার্সি না পরলেও আর্জেন্টিনার সঙ্গে তাঁর আবেগের সম্পর্ক অটুট থাকবে।
পরিবার, কোচ, সতীর্থ এবং ম্যানেজারদের প্রতিও বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মেসি। তাঁর দীর্ঘ ও কঠিন ফুটবলযাত্রায় যারা পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। সতীর্থদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া অসংখ্য স্মৃতি ও মুহূর্তকে জীবনের অমূল্য সম্পদ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
সবশেষে আবেগঘন ভাষায় আর্জেন্টিনার মানুষের উদ্দেশে বিদায়ী বার্তা দিয়েছেন মেসি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তাঁকে আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম দেওয়ার জন্য। তাঁর শেষ বার্তাও ছিল দেশকে ঘিরে-আর্জেন্টিনা এগিয়ে যাক।
মেসির বিদায়ের সঙ্গে শুধু একটি ফুটবল অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলের একটি যুগেরও অবসান ঘটল। যে জার্সি পরে তিনি হতাশা, কান্না, সমালোচনা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন, সেই জার্সিতে আর তাঁকে দেখা যাবে না। তবে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে লিয়োনেল মেসির নাম যে চিরকালই বিশেষ এক অধ্যায়ে লেখা থাকবে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।
-আনন্দবাজার অবলম্বনে




