জয়ন্ত আচার্য
সাংবাদিক–গবেষক
আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণ
ভিনিউজ : যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয় দেশটির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন আগামী দুই বছরের জন্য বড় রাজনৈতিক ও আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রস্তুতি এবং দুই দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রতিযোগিতা। রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও বিবিসির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে, আগামী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, রিপাবলিকান নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস, ডেমোক্র্যাটদের আদর্শিক বিভাজন এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা।
২০২৮ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাংবিধানিক সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন না। ট্রাম্প ২০১৬ ও ২০২৪ সালে নির্বাচিত হওয়ায় তাঁর তৃতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পথ বন্ধ। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচন হবে ট্রাম্প-পরবর্তী রিপাবলিকান নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ডেমোক্র্যাটদের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের লড়াই। এখন পর্যন্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি। তবে দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে শুরু করেছেন।
রিপাবলিকান শিবিরে সবচেয়ে আলোচিত নাম ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তাঁকে দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাব্য প্রধান প্রার্থী মনে করা হচ্ছে। কিন্তু মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় তাঁর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের দায় থেকে তিনি কতটা নিজেকে আলাদা করতে পারবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
৭ নভেম্বর রয়টার্সের প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের পর ভ্যান্স নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে কিছুটা স্বতন্ত্রভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো বিষয়কে সামনে এনে তিনি ট্রাম্পের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে ট্রাম্পের সমর্থকভিত্তি ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তাহীন নীতিগুলো থেকে দূরত্ব বজায় রাখা ভ্যান্সের জন্য কঠিন সমীকরণ হয়ে উঠতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নামও রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। তবে তিনি সম্প্রতি জানিয়েছেন, আপাতত ২০২৮ সালের নির্বাচন নিয়ে তাঁর কোনো পরিকল্পনা নেই এবং ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ পর্যন্ত প্রশাসনে থাকার ইচ্ছাই তাঁর রয়েছে। এ ছাড়া সিনেটর টেড ক্রুজ, ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিসান্টিস এবং আরকানসাসের গভর্নর সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্সের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। রিপাবলিকানদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ট্রাম্পের ‘মাগা’ সমর্থকগোষ্ঠী ধরে রেখেও তরুণ, হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন পুনরুদ্ধার করা।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পরিস্থিতি আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় সাফল্য দলটির সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফ, পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শ্যাপিরো, ইলিনয়ের গভর্নর জেবি প্রিৎজকার এবং ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে। জন অসফের জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত হওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য। একই ভাবে পেনসিলভানিয়ার মতো দোদুল্যমান রাজ্যে জশ শ্যাপিরোর বড় জয় তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, সাবেক পরিবহনমন্ত্রী পিট বুটিজেজ এবং কেনটাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেশিয়ারও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটিক দলের অন্তত ৩০ জন নেতা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
তবে ডেমোক্র্যাটদের সামনে বড় প্রশ্ন দলটি কোন আদর্শিক পথে এগোবে। দলের মধ্যপন্থীরা মনে করেন, সাধারণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হলে অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, করনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে বাস্তববাদী অবস্থান নিতে হবে। অন্যদিকে প্রগতিশীল নেতারা মনে করেন, শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আরও সাহসী কর্মসূচি প্রয়োজন। মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদের সিনেট নির্বাচনে জয় এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেট নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং রাজনীতিতে করপোরেট প্রভাব হ্রাসের মতো বিষয় তাঁর প্রচারণায় গুরুত্ব পেয়েছে। নিউইয়র্কের কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজও প্রগতিশীল ধারার গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলেছে। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির মূল্য, শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে অসন্তোষ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। সিবিএস নিউজের নির্বাচনী বিশ্লেষণেও জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভোটারদের সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচনে শুধু রাজনৈতিক আদর্শ বা ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন ব্যয়ের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কেবল একজন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিযোগিতা হবে না; এটি হবে ট্রাম্প-পরবর্তী আমেরিকার রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণের লড়াই। রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কতটা বহন করবে, ডেমোক্র্যাটরা মধ্যপন্থা ও প্রগতিশীলতার মধ্যে কোন পথ বেছে নেবে এবং কোন দল সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা পূরণে বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি দিতে পারবে, এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণ করবে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় হোয়াইট হাউসের নিশ্চয়তা নয়।২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং দুই দলের প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের চিত্র বদলে দিতে পারে।




