ভিনিউজ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রগতিশীল বামপন্থীদের উত্থানে নতুন মাত্রা যোগ করলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নিথ্যা রমন। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মেয়র ক্যারেন বাসকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছেন ৪৫ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রাথমিক ফলাফলে তিনি পেয়েছেন ৫২ দশমিক ১ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে ক্যারেন বাস পেয়েছেন ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ। বৃহস্পতিবার পরাজয় স্বীকার করে রমনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাস। এর মধ্য দিয়ে দুই দশকের বেশি সময় পর লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রথমবারের মতো কোনো নির্বাচিত মেয়র পুনর্নির্বাচনে পরাজিত হলেন।
নিথ্যা রমনের এই জয় শুধু একটি শহরের নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তরুণ ও প্রগতিশীল নেতৃত্বের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরও ইঙ্গিত। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে তা
র রাজনৈতিক দর্শন ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মিল থাকায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও দুজনকে পাশাপাশি আলোচনা করা হচ্ছে।
কে এই নিথ্যা রমন? দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে জন্ম তাঁর। ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানেই বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে নগর পরিকল্পনায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশায় তিনি একজন নগর পরিকল্পনাবিদ। নগরায়ণ, আবাসন, পরিবেশ ও গৃহহীন মানুষের সমস্যা নিয়ে কাজ করতে গিয়েই রাজনীতিতে তাঁর সম্পৃক্ততা বাড়ে।
রাজনীতিতে তাঁর উত্থানও বেশ উল্লেখযোগ্য। ২০২০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলের চতুর্থ ডিস্ট্রিক্টের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েন তিনি। হন সিটি কাউন্সিলে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম দক্ষিণ এশীয় এবং প্রথম এশীয়-আমেরিকান নারী। ২০২৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন। কাউন্সিলর হিসেবে গৃহহীন মানুষের জন্য কার্যকর সেবা, সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কাজ করেছেন।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে তাঁর তুলনার প্রধান কারণ রাজনৈতিক আদর্শ। দুজনই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, আবাসন সংকট মোকাবিলা ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাসের পক্ষে কথা বলেন। মামদানি নিউইয়র্কে বিনা মূল্যে শিশু পরিচর্যা, সাশ্রয়ী পরিবহন ও ভাড়ার নিয়ন্ত্রণের মতো প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে রমনের নির্বাচনী অগ্রাধিকারে রয়েছে সাশ্রয়ী আবাসন, গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন, জননিরাপত্তা, গণপরিবহন এবং নগরজীবনের মান উন্নয়ন।

তবে দুজনের রাজনৈতিক পরিচয় এক হলেও তাঁদের কাজের ক্ষেত্র ও বাস্তবতা আলাদা। মামদানি নিউইয়র্কের রাজনীতিতে জাতীয় পর্যায়ের পরিচিতি পেয়েছেন। রমনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা মূলত স্থানীয় সরকার ও নগর ব্যবস্থাপনাকেন্দ্রিক। নিজেও মামদানির সঙ্গে তুলনা প্রসঙ্গে বলেছেন, তাঁর নেতৃত্বের দক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে রমনের জয়ের পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। লস অ্যাঞ্জেলেসে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট। ২০২৫ সালের হিসাবে শহরটিতে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ গৃহহীন ছিলেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্যালিসেডস ও ইটন দাবানলে ৩১ জনের মৃত্যু এবং ১৬ হাজারের বেশি স্থাপনা ধ্বংস হওয়ার ঘটনায় মেয়র ক্যারেন বাসের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি ও কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তোষ নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রমন নির্বাচনী প্রচারে বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য আবাসন ব্যয় কমানো, গৃহহীন মানুষের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন, রাস্তাঘাট ও গণপরিবহন উন্নত করা এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা করা। একই সঙ্গে হলিউডের কর্মসংস্থান রক্ষা এবং অভিবাসীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও তাঁর অগ্রাধিকারে রয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের পরবর্তী মেয়রের সামনে দায়িত্বও কম নয়। ২০২৭ সালের সুপার বোল এবং ২০২৮ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে হবে তাঁকে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শহরে আবাসন, নিরাপত্তা, পরিবহন ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আয়োজন সফল করাও হবে বড় পরীক্ষা।
নিথ্যা রমনের জয় তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব উন্নয়নে রূপ দিতে পারলে তাঁর নেতৃত্ব শুধু লস অ্যাঞ্জেলেস নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নগর রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে
-বিবিসি অবলম্বনে




