তাহেরপুর থেকে টাইমস স্কয়ার: বিশ্বমঞ্চে বাঙালির দুর্গোৎসবের জয়যাত্রা

ভিনিউজ | বিশেষ সম্পাদকীয়

জয়ন্ত আচার্য
সিনিয়র সাংবাদিক -গবেষক

দেবী দুর্গার আগমন মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে উৎসবের আবহ। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, ধুনুচি নাচ, অঞ্জলি আর প্রতিমার সৌন্দর্যে শরতের প্রকৃতি যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। কিন্তু দুর্গোৎসবের এই আয়োজন এখন আর শুধু বাংলা কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের তাহেরপুর থেকে কলকাতা, সেখান থেকে লন্ডন, নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার, টরন্টো, সিডনি, মেলবোর্ন, প্যারিস কিংবা টোকিও, বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালির এই শারদীয় উৎসব। দুর্গাপূজা আজ ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের আন্তর্জাতিক প্রকাশ।

দুর্গাপূজার সূচনা নিয়ে পৌরাণিক কাহিনি ও ঐতিহাসিক বিবরণের মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা। পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ঋষি মেধসের আশ্রমে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি দেবীর আরাধনা করেছিলেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য অংশে রাজা সুরথ ও সমাধির দেবী উপাসনার কাহিনি পাওয়া যায়। সেই বর্ণনায় বসন্তকালের পূজার প্রসঙ্গও রয়েছে। এ কারণে বসন্তকালীন বাসন্তী পূজাকে দুর্গার প্রাচীন আরাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অন্যদিকে রামায়ণের প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ এবং সীতা উদ্ধারের উদ্দেশ্যে শ্রীরাম শরৎকালে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে দেবীর আরাধনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শারদীয় দুর্গাপূজার বিশেষ ঐতিহ্য। সেই থেকে শরৎকালের দুর্গোৎসব বাঙালির প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়। তবে এসব কাহিনির বিবরণ বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ ও লোকঐতিহ্যে ভিন্নভাবে এসেছে।

বাংলার দুর্গোৎসবের ইতিহাসে বাংলাদেশের রাজশাহীর তাহেরপুর এক বিশেষ ঐতিহাসিক নাম। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ রায় ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে বিপুল অর্থ ব্যয়ে জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। কথিত আছে, সোনা-রুপা ও মূল্যবান উপকরণ দিয়ে দেবীর প্রতিমা এবং পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। এই আয়োজন বাংলায় বৃহৎ পরিসরে শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। যদিও বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তাহেরপুরের এই ঐতিহ্য বাঙালির পূজার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

পরবর্তী সময়ে রাজবাড়ি ও জমিদারবাড়ির গণ্ডি পেরিয়ে দুর্গাপূজা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বারোয়ারি পূজার প্রচলন এবং পরে সর্বজনীন পূজার বিস্তার উৎসবটিকে সর্বস্তরের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত করে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি যুক্ত হয় সংগীত, নাটক, শিল্পকলা, সামাজিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। এভাবেই দুর্গোৎসব বাঙালির সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

এই ঐতিহ্য আজ ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে দুর্গাপূজার আয়োজন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালে ম্যানহাটনের ফাদার ডাফি স্কয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত এই উৎসবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে বাঙালিরা সমবেত হন। লন্ডনের সুইস কটেজ ও ইলিং টাউন হলে কয়েক দিনব্যাপী পূজার আয়োজনে অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ। সেখানে প্রতিমা দর্শন, অঞ্জলি, ভোগ, ঢাকের বাদ্য এবং বাংলা গান-নাচের পাশাপাশি ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের উপস্থিতিও উৎসবকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে।

কানাডার টরন্টো, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, মেলবোর্ন ও পার্থে নিয়মিত দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৭০-এর দশক থেকেই বাঙালি সম্প্রদায়ের উদ্যোগে পূজার আয়োজন শুরু হয়। মেলবোর্নে বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অব ভিক্টোরিয়ার উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এমনকি প্রবাসী বাঙালি পরিবারগুলো নিজেদের বাড়িতেও আয়োজন করছে পারিবারিক দুর্গোৎসব। প্রতিবছর মেলবনে ডা: জগন্নাথ ও সন্ধ্যা চাট্টাজ্জীর বাড়িতে জাকজমক ভাবে শাস্ত্রিয় মতে দূর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয় । এ সময় পুরো বাড়ি মেতে ওঠে উৎসবে। ব ইউরোপের যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পূজার আয়োজন রয়েছে। আফ্রিকার নাইজেরিয়ার লাগোসে ১৯৮১ সাল থেকে দুর্গোৎসব পালনের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। এশিয়ায় সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও হংকংয়েও বাঙালিরা দেবীর আরাধনায় মিলিত হন। মধ্যপ্রাচ্যের বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানেও প্রবাসীদের উদ্যোগে পূজার আয়োজন হয়েছে এবছর ।

এই আন্তর্জাতিক বিস্তারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার শেকড় পৌঁছে দেওয়া। বিদেশের পূজামণ্ডপে শিশুরা বাংলা গান শেখে, শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে, ঢাকের তালে নাচে, আলপনা আঁকে। একই সঙ্গে স্থানীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও এই উৎসবে অংশ নেন। ফলে দুর্গোৎসব হয়ে উঠছে আন্তসাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপূজাকে ইউনেসকো মানবজাতির অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এই স্বীকৃতি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের নয়, বরং বাঙালির শিল্প, সৃজনশীলতা, সামাজিক অংশগ্রহণ ও ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের ঐতিহাসিক আয়োজন থেকে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার, দুর্গোৎসবের এই দীর্ঘ যাত্রা বাঙালির সাংস্কৃতিক শক্তিরই পরিচয়। সময় বদলেছে, বদলেছে আয়োজনের ধরন, বদলেছে পূজামণ্ডপের অবস্থান। কিন্তু বদলায়নি শেকড়ের টান। পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙালি হিন্দু বসতি গড়ুক, শরৎ এলেই তার হৃদয়ে বেজে ওঠে ঢাকের শব্দ। দেবী দুর্গার আরাধনা তাই আজ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বিশ্বমঞ্চে বাঙালির পরিচয়, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল জয়যাত্রা।

পূর্বের খবরপাঁচ হাজার বছর আগেই মিশরের সিংহাসনে নারী! নতুন গবেষণায় উন্মোচিত হলো ‘নারী রাজা’ মেরিটনিথের রহস্য
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!