প্রকৃতি রক্ষায় বৈশ্বিক চুক্তির লক্ষ্যগুলো অর্জনে পিছিয়ে পড়ায় সেগুলো বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে সোমবার আর্মেনিয়ায় প্রায় ২০০টি দেশ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃতি ধ্বংসের অবসান ঘটানো ও তা পুনরুদ্ধারের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
চার বছর আগে অধিকাংশ দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃতি ধ্বংস বন্ধ ও বিপরীতমুখী করার ঐতিহাসিক আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। তবে এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকারগুলোর অগ্রগতি ধীর।
প্রকৃতির জন্য ‘প্যারিস চুক্তি’ হিসেবে পরিচিত এ সমঝোতার অনেক লক্ষ্যই অর্জনের পথে পিছিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে পৃথিবীর স্থলভাগ ও সমুদ্রের ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারও রয়েছে।
চুক্তির সবচেয়ে কঠিন লক্ষ্যগুলোর কয়েকটি—যেমন জীবাশ্ম জ্বালানি ও অন্যান্য প্রভাবশালী শিল্প খাতে ভর্তুকি কমানো—বাস্তবায়নে সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে।
ইয়েরেভান থেকে এএফপি জানায়, জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক আলোচনা, যা কপ-১৭ নামে পরিচিত, শুরুর আগে শুক্রবার আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান বলেন, ‘আমাদের সৎভাবে স্বীকার করতে হবে, সম্মিলিতভাবে আমরা প্রয়োজনীয় গতিতে এগোতে পারিনি।’
এমন এক সময়ে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন সরকারি অর্থায়ন চাপের মুখে এবং রাজনৈতিক মনোযোগ সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের দিকে কেন্দ্রীভূত।
আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগে উচ্চপর্যায়ের এক অধিবেশনে জাতিসংঘের প্রধান আন্তোনিও গুতেরেসসহ মাত্র কয়েকজন বিশ্বনেতা অংশ নেন। তাঁদের অধিকাংশই মধ্য এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান।
তবে শুক্রবারের ওই অনুষ্ঠানে গুতেরেস বলেন, এ সম্মেলনের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন ‘যুদ্ধের’ কথা উল্লেখ করে বলেন, এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবী বসবাসযোগ্য থাকবে কি না, তা হুমকির মুখে পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের আরও পদক্ষেপ, আরও গতি এবং আরও সদিচ্ছা প্রয়োজন।’
গুতেরেস বলেন, ‘২০৩০ সালের লক্ষ্যে পৌঁছানোর সময়ের অর্ধেক পেরিয়ে ইয়েরেভান এখন জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি যথেষ্ট করছি?’
লক্ষ্য অর্জনে অগ্রগতি অপর্যাপ্ত
কপ-১৭ শুরুর আগে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নির্ধারিত ২৩টি লক্ষ্যের দিকে অগ্রগতি হচ্ছে। তবে সেই অগ্রগতি অসম এবং ২০৩০ সালের সময়সীমার মধ্যে লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়।
সম্মেলনে অর্থায়ন একটি বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রয়োজনীয় অর্থায়নে যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণের উদ্যোগ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অর্থায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে ইউরোপের দেশসহ অন্যান্য ধনী রাষ্ট্রের। তবে এসব দেশ চীনসহ বড় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকেও অর্থায়নে অবদান রাখার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
তবে সম্মেলনে সরকারি অর্থের পরিবর্তে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কীভাবে অর্থায়নের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রকৃতি সংরক্ষণে সহায়তার জন্য জাতিসংঘের প্রায় শূন্য তহবিলে মুনাফার একটি অংশ অনুদান হিসেবে দিতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করা সম্মেলনের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে।
জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধের আহ্বান
গুতেরেস আহরণনির্ভর শিল্পে সরকারের প্রণোদনার বিষয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ক্ষতিকর ভর্তুকি সংস্কারের অঙ্গীকার করেও সরকারগুলো ‘ভুল খাতে অর্থ ব্যয় করছে’ বলে তিনি সমালোচনা করেন।
কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়া মানে আত্মহত্যায় ভর্তুকি দেওয়া।’ তাঁর ভাষায়, এসব জ্বালানি ‘আমাদের গ্রহকে উত্তপ্ত করছে এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য অভিশাপ হয়ে উঠেছে’।
ককেশাস অঞ্চলের পার্বত্য দেশ আর্মেনিয়ার জন্য এ সম্মেলন দেশটির আয়োজিত বৃহত্তম আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোর অন্যতম। আগামী দুই সপ্তাহে এখানে হাজার হাজার অতিথির সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আয়োজকরা জোর দিয়ে বলেছেন, কপ-১৭-এর সাফল্য নতুন অঙ্গীকার ঘোষণার ওপর নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে।
ডব্লিউডব্লিউএফ ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট আদিল নাজাম শুক্রবার বলেন, ‘বিশ্বের নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন নেই। আমাদের তা রয়েছে। এখন প্রয়োজন তা বাস্তবায়ন করা।’




