বিশেষ প্রতিবেদন :
ভিনিউজ ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি দৃশ্যমান হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক উপস্থিতিতে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের জায়গা নিতে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে জর্জ ওয়াশিংটন এশিয়া ছাড়লে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সাময়িকভাবে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী থাকবে না।
মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য এটি শুধু একটি রণতরী স্থানান্তরের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৈশ্বিক সামরিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ইরানকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ওপর এমন চাপ তৈরি করছে, যার প্রভাব অন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলেও পড়তে পারে।
২৬৬ দিনের মোতায়েন, চাপে আব্রাহাম লিংকন
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের অভিযান ইতিমধ্যে অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হয়েছে। রণতরীটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। পরবর্তী সময়ে ইরান সংঘাতের কারণে এর মোতায়েনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে জাহাজটি ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে রয়েছে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম দীর্ঘ ধারাবাহিক মোতায়েন।
দীর্ঘ এই অভিযানের কারণে রণতরীটির প্রায় ৫ হাজার সদস্যের কর্মপরিবেশ, সরবরাহ ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পানি, খাবার, রক্ষণাবেক্ষণ, চিঠিপত্র পৌঁছানো এবং দীর্ঘদিন বন্দরে না ভেড়ানোর মতো বিষয় নিয়ে সমস্যার কথা উঠে এসেছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব প্রতিবেদনকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেছেন এবং নৌবাহিনীও জাহাজটির সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সংকটের মাত্রা নিয়ে প্রকাশিত কিছু অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তবে দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার ফলে নাবিকদের ওপর যে শারীরিক ও মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। ওয়াশিংটনের জন্য এখন জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠিয়ে লিংকনের কুরুদের বিশ্রাম ও পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ জর্জ ওয়াশিংটনের যাত্রা?
ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন একটি নিমিটজ-শ্রেণির পারমাণবিকচালিত বিমানবাহী রণতরী। এ ধরনের রণতরী যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। একটি বিমানবাহী রণতরীর সঙ্গে সাধারণত যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার এবং সহায়ক যুদ্ধজাহাজের সমন্বয়ে বড় একটি নৌবহর কাজ করে।
ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর থেকে জর্জ ওয়াশিংটনের সরে যাওয়া মানে শুধু একটি জাহাজের অনুপস্থিতি নয়। এতে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক বিমান ও নৌ-শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা সাময়িকভাবে কমে যাবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ওই অঞ্চলে অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ, বিমানঘাঁটি ও মিত্রদেশগুলোর সামরিক অবকাঠামো রয়েছে, তবু বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতির প্রতীকী ও কৌশলগত গুরুত্ব আলাদা।
সুবিধা নিতে পারে চীন
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর সাময়িক অনুপস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে চীনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালি এবং পূর্ব চীন সাগর-এই বিস্তৃত অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সামরিক প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী সরে যাওয়ার কারণে চীন তাইওয়ানে সামরিক অভিযান শুরু করবে-এমন আশঙ্কা বাস্তবসম্মত নয়। তবে বেইজিং এই সুযোগকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন, নৌ ও বিমান মহড়া বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহার করতে পারে।
এতে জাপান, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর মধ্যেও ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিককে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করার পর এ ধরনের সামরিক পুনর্বিন্যাস স্বাভাবিকভাবেই নজর কাড়ছে।
মিত্রদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা
তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, একটি বিমানবাহী রণতরী অন্য অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া মানেই ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে ওয়াশিংটনের কৌশলগত সরে আসা নয়। মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বার্তাও দিচ্ছে দেশটি।
সম্প্রতি মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ফিলিপাইনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং যৌথ সামরিক মহড়া ও আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদারের কথা জানিয়েছেন। ওয়াশিংটনের যুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে প্রয়োজন অনুযায়ী আবারও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে-একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক, দুই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে কীভাবে পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি ধরে রাখা যায়। ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিমানবাহী রণতরীর মতো সীমিত ও উচ্চমূল্যের সামরিক সম্পদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘ মোতায়েনের কারণে নৌসদস্যদের বিশ্রাম, রক্ষণাবেক্ষণ ও জাহাজের প্রস্তুতিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যের পথে যাত্রা শুধু একটি রণতরীর স্থানান্তর নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক অগ্রাধিকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার বড় পরীক্ষার ইঙ্গিত। একদিকে ইরান সংঘাতের সামরিক চাপ, অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা-দুই দিক সামলাতে গিয়ে ওয়াশিংটনকে এখন অত্যন্ত সতর্ক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।




