সরকারের ছয় মাসে অর্থনীতি: কিছু সূচকে স্বস্তি, তবু সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলন কম

 

সম্পাদকীয়

জয়ন্ত আচার্য

বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিললেও সামগ্রিকভাবে স্বস্তি ফেরেনি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতিকে সহায়তা করছে এবং ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থানের ধীরগতি ও ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা এখনো অর্থনীতির ওপর বড় চাপ হয়ে আছে। ফলে কাগজে কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রতিফলন সীমিত।

সরকারের ছয় মাসের অর্থনৈতিক চিত্র মূল্যায়ন করলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা মূল্যস্ফীতি। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, সঞ্চয়ের মূল্য কমেছে এবং খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ব্যয় বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ বাজারে পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম কিছুটা ধীরগতিতে বাড়া। ফলে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে আসেনি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনমানের অবনমন পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি। এ অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে, তবে বড় পরিসরে বাস্তবায়নের আগে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন ও সঠিক নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।

অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা বিনিয়োগ। সরকারের বিভিন্ন বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ-
একক জানালা সেবা, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার বিস্তার, ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিনিয়োগ নসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সংস্কার-ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো দুর্বল। উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকঋণের সীমিত প্রবাহ, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে জটিল করে তুলেছে।

বিশেষ করে জ্বালানি সংকট বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসের ঘাটতি শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করছে, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে উৎপাদন খরচ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা।প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানির উৎস বৈচিত্র্য, শক্তিদক্ষতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। কারণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস ছাড়া শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান-কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো সম্ভব নয়।

অন্যদিকে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতিকে সহায়তা করছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকানো গেছে। রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে। তবে এই উন্নতিকে টেকসই করতে রপ্তানির পরিধি ও বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি।

রাজস্ব আদায়েও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ আয় কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাড়ছে না। করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং করছাড় কমানোর মতো সংস্কার জরুরি হলেও এসব বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন। অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তা অর্জন করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত সরকারের ঋণ বাড়তে পারে অথবা উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হতে পারে।

ব্যাংকিং খাতও অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি। দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের সুবিধা এবং পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি ব্যাংক খাতকে ভঙ্গুর করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে। ব্যাংক পুনর্গঠন বা পুনর্মূলধনের প্রয়োজন হলে জনগণের অর্থ ব্যবহারের আগে ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদ, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি এবং খেলাপি ঋণ উদ্ধারের পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি।

কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও অর্থনীতির বড় পরীক্ষা। সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির মতো উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখনো তার সুস্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য রূপরেখা সাধারণ মানুষের সামনে পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। সরকারি চাকরির মাধ্যমে এই বিপুল কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, জাহাজ নির্মাণ ও রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

অর্থনীতির সামনে বৈদেশিক ঝুঁকিও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘ হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করবে। রপ্তানি দুর্বল হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। এর সঙ্গে ব্যাংক পুনর্গঠনের সম্ভাব্য ব্যয়, উচ্চ সুদের হার, এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তাও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতির আভাস মিলেছে, কিন্তু স্বস্তি এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়। রিজার্ভ বেড়েছে, রেমিট্যান্স সহায়তা দিচ্ছে এবং সংস্কারের কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছে-এগুলো ইতিবাচক দিক। কিন্তু মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতি এখনো সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে কঠিন করে রেখেছে।

আগামী দিনে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এই ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে বাস্তব ফলাফলে পরিণত করা। মূল্যস্ফীতি টেকসই ভাবে কমানো, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, বাস্তবসম্মত রাজস্বনীতি এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির সাফল্য শুধু রিজার্ভ, প্রবৃদ্ধি বা বাজেটের অঙ্কে নয়-সাধারণ মানুষের আয়, কর্মসংস্থান এবং বাজারের ব্যাগ কতটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে, তার ওপরই নির্ভর করবে

পূর্বের খবরআনন্দবাজার প্রতিবেদন : গ্রেফতার অভিনেত্রী অন্তরা বন্দ্যোপাধ্যায়
পরবর্তি খবরইরান যুদ্ধের চাপ: পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর থেকে শেষ মার্কিন বিমানবাহী রণতরীও সরছে
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!