আদিত্য আচার্য রুদ্র
বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আবেগ, স্বপ্ন ও গৌরবের প্রতীক। প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বের সেরা দলগুলো যখন বিশ্বসেরার মুকুট জয়ের লড়াইয়ে নামে, তখন গোটা পৃথিবী যেন এক সুতোয় বাঁধা পড়ে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে অসংখ্য নাটকীয় ফাইনাল, অবিস্মরণীয় সেমিফাইনাল, কিংবদন্তি ফুটবলার এবং আলোচিত ঘটনা ফুটবলকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। আর ২০৩০ সালে বিশ্বকাপ শতবর্ষে পদার্পণ করতে যাচ্ছে, যা উদ্যাপনে বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ফিফা।
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে স্বাগতিক উরুগুয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করে। সেমিফাইনালে উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা উভয়ই ৬-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে ফাইনালে ওঠে। এরপর ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে টানা দুইবার শিরোপা জিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ইতালি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত না হলেও ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে ফিরে আসে বিশ্বকাপ। সেই আসরে মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে উরুগুয়ের শিরোপা জয় ইতিহাসে ‘মারাকানাজো’ নামে অমর হয়ে আছে।
১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানির হাঙ্গেরিকে হারানোর ‘বার্নের অলৌকিক ঘটনা’, ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে পেলের আবির্ভাব, ১৯৬২ সালে গারিঞ্চার নৈপুণ্য এবং ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়-সবকিছুই বিশ্বকাপকে নতুন মাত্রা দেয়। ১৯৭০ সালে পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিলের তৃতীয় শিরোপা জয়কে অনেকেই সর্বকালের সেরা দলীয় পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচনা করেন। ১৯৭৪ সালে ইয়োহান ক্রুইফের ‘টোটাল ফুটবল’ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলেও শিরোপা জেতে পশ্চিম জার্মানি। ১৯৭৮ সালে স্বাগতিক আর্জেন্টিনা প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

১৯৮২ সালে ইতালিকে শিরোপা এনে দেন পাওলো রোসি। তবে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ হয়ে আছে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং শতাব্দীর সেরা গোলের পর আর্জেন্টিনাকে তিনি শিরোপা এনে দেন। ১৯৯০ সালে পশ্চিম জার্মানি প্রতিশোধ নিয়ে আর্জেন্টিনাকে হারায়। ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো টাইব্রেকারে নিষ্পত্তি হওয়া ফাইনালে ইতালিকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল; রবার্তো বাজ্জিওর পেনাল্টি মিস আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত।
১৯৯৮ সালে জিনেদিন জিদানের জোড়া হেডে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতে ফ্রান্স। ২০০২ সালে রোনালদোর জোড়া গোলে জার্মানিকে হারিয়ে পঞ্চম বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল। ২০০৬ সালে ইতালি-ফ্রান্স ফাইনালে জিদানের মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে আঘাত করার ঘটনা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়। ২০১০ সালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার অতিরিক্ত সময়ের গোলে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে স্বাগতিক ব্রাজিলের ৭-১ গোলের বিধ্বংসী পরাজয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোর একটি। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে জার্মানি চতুর্থ শিরোপা জেতে। ২০১৮ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ফ্রান্স দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। আর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপকে অনেকেই সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে মনে করেন। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ও কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সের মধ্যকার রুদ্ধশ্বাস লড়াই ৩-৩ গোলে শেষ হলে টাইব্রেকারে জিতে দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটায় আর্জেন্টিনা। মেসি পূর্ণ করেন নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ছিল ইতিহাসের প্রথম ৪৮ দলের আসর এবং প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। ফাইনালে স্পেন অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। সেমিফাইনালে স্পেন ফ্রান্সকে এবং আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে। লামিন ইয়ামাল, রদ্রি, লিওনেল মেসি ও এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ছিলেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলারদের মধ্যে।
এবার অপেক্ষা ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের। শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে এবার আয়োজনেও থাকছে ইতিহাসের ছোঁয়া। ফিফা ঘোষণা করেছে, মূল আয়োজক হবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। তবে প্রথম বিশ্বকাপের স্মৃতি ধরে রাখতে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে একটি করে উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ফলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন মহাদেশের ছয়টি দেশে বিশ্বকাপের আয়োজন হতে যাচ্ছে। মন্টেভিডিওতে শতবর্ষ উদ্যাপন, বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহাসিক প্রদর্শনী এবং বিশ্বকাপের একশ বছরের গৌরবময় যাত্রাকে তুলে ধরতে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে ফিফা।
এক শতাব্দীর এই পথচলায় বিশ্বকাপ শুধু চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করেনি, জন্ম দিয়েছে পেলে, ম্যারাডোনা, জিদান, রোনালদো, রোনালদিনহো, মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, এমবাপ্পে ও লামিন ইয়ামালের মতো কিংবদন্তিদের। তাই ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হবে শুধু আরেকটি ফুটবল আসর নয়, বরং ফুটবলের শতবর্ষের গৌরব, ইতিহাস, আবেগ ও ভবিষ্যতের এক মহাউৎসব।




