ইংরেজি ভাষার নতুন পরিচয় গড়েছে আমেরিকা, বদলে দিয়েছে বিশ্বভাষার রূপ

 

ফিচার ডেস্ক

ভিনিউজ : একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু স্বাধীনতার পর শুধু রাজনীতি বা অর্থনীতিতেই নয়, ভাষার ক্ষেত্রেও নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছিল দেশটি। সেই প্রচেষ্টার ফলেই জন্ম নেয় এমন এক আমেরিকান ইংরেজি, যা আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগের অংশ। বানান, উচ্চারণ, শব্দভান্ডার এমনকি ব্যাকরণেও ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে আলাদা একটি ভাষাগত পরিচয় তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার পরপরই দেশটির তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন বিশ্বাস করতেন, নতুন রাষ্ট্রের নতুন বাস্তবতা প্রকাশ করতে হলে নতুন শব্দ ও নতুন ভাষাশৈলীর প্রয়োজন হবে। ১৮১৩ সালে লেখা এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, নতুন সমাজ, নতুন আবহাওয়া, নতুন পেশা ও নতুন অভিজ্ঞতা ভাষাকেও নতুন রূপ দিতে বাধ্য করবে। তাঁর মতে, আমেরিকার ভাষা একদিন নাম ও শক্তি-উভয় দিক থেকেই ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে আলাদা পরিচয় পাবে।

তবে ভাষার এই পরিবর্তন শুরু হয়েছিল আরও আগে। ১৭৫৬ সালেই ব্রিটিশ লেখক স্যামুয়েল জনসন আমেরিকান ইংরেজিকে মূল ভাষার এক ধরনের ‘বিকৃতি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে, সেটি কোনো বিকৃতি নয়; বরং ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনেরই একটি অধ্যায়।

স্বাধীনতার পর আমেরিকান ইংরেজির সবচেয়ে বড় রূপকার ছিলেন অভিধান প্রণেতা নোয়া ওয়েবস্টার। তিনি মনে করতেন, স্বাধীন দেশের নিজস্ব ভাষা ও বানান থাকা উচিত। তাঁর অভিধান ও বানানবিধির মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ব্রিটিশ বানানের ‘honour’ হয়ে যায় ‘honor’, ‘favour’ হয় ‘favor’, ‘centre’ বদলে ‘center’, ‘draught’ হয় ‘draft’। আজ এই বানানগুলোই আমেরিকান ইংরেজির মানদণ্ড।

অবশ্য ওয়েবস্টারের সব প্রস্তাব সফল হয়নি। তিনি ‘tongue’-এর বদলে ‘tung’ এবং ‘leather’-এর বদলে ‘lether’ লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো ভাষাভাষীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তবুও তাঁর প্রকাশিত American Spelling Book পরবর্তী এক শতকে প্রায় ১০ কোটি কপি বিক্রি হয় এবং আমেরিকান ইংরেজির ভিত্তি নির্মাণে অসাধারণ ভূমিকা রাখে।

নতুন মহাদেশে বসতি স্থাপনের ফলে ইউরোপীয় ভাষার পাশাপাশি স্থানীয় আদিবাসীদের ভাষা থেকেও অসংখ্য শব্দ ইংরেজিতে যুক্ত হয়। ‘স্কাঙ্ক’, ‘র্যাকুন’, ‘চিপমাঙ্ক’, ‘মুজ’, ‘অপোসাম’ ও ‘ক্যারিবু’-এসব শব্দ এসেছে উত্তর আমেরিকার আদিবাসী ভাষা থেকে। অন্যদিকে ফরাসি ভাষা থেকে এসেছে ‘প্রেইরি’, ডাচ ভাষা থেকে ‘কুকি’ শব্দটি জনপ্রিয় হয়েছে।

শুধু নতুন শব্দই নয়, পুরোনো ব্রিটিশ শব্দেরও নতুন জীবন দিয়েছে আমেরিকা। বর্তমানে ‘fall’ শব্দটি অনেকেই আমেরিকান ইংরেজির বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন। অথচ ব্রিটেনে কয়েক শতাব্দী আগে ‘autumn’-এর পাশাপাশি ‘fall’-ও ব্যবহৃত হতো। পরে ব্রিটেনে শব্দটি হারিয়ে গেলেও আমেরিকায় সেটি টিকে যায়। একইভাবে ‘gotten’ শব্দটিও ব্রিটেনে প্রায় বিলুপ্ত হলেও আমেরিকায় এখনো বহুল ব্যবহৃত।

এমন আরও অনেক শব্দ রয়েছে, যেগুলো দুই দেশের ভাষাগত পার্থক্য স্পষ্ট করে। যুক্তরাষ্ট্রে ‘soccer’ যেখানে ফুটবল বোঝায়, ব্রিটেনে সেখানে ‘football’ প্রচলিত। আবার ‘mad’, ‘smart’, ‘pants’, ‘baggage’ কিংবা ‘pitcher’-এর মতো শব্দগুলোর ব্যবহার ও অর্থেও রয়েছে ভিন্নতা।

তবে ভাষার এই ভিন্নতা কোনো বিচ্ছিন্নতার গল্প নয়। উনিশ শতক পর্যন্ত ধনী আমেরিকান পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ডে পাঠাত। দুই দেশের মধ্যে বই, সংবাদপত্র, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও ছিল নিয়মিত। ফলে ভাষা আলাদা হলেও দুই ধারার ইংরেজি একে অপরকে প্রভাবিত করতে থাকে।

বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভাষা পরিবর্তনের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভাষাবিদদের গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল, দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন শব্দ তৈরির প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ‘Amirite’, ‘cosplay’, ‘lituation’, ‘lordt’ কিংবা ‘boolin’-এর মতো শব্দগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমেই দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

গবেষকেরা মনে করেন, আফ্রিকান-আমেরিকান সম্প্রদায়ের ভাষাগত সৃজনশীলতা আধুনিক আমেরিকান ইংরেজিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। নিজেদের পরিচয়, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা প্রকাশের প্রয়োজন থেকেই তারা নিয়মিত নতুন শব্দ ও নতুন বাক্যগঠন তৈরি করছেন। পরবর্তীতে এসব শব্দ মূলধারার ভাষায়ও জায়গা করে নিচ্ছে।

একসময় ধারণা করা হয়েছিল, আমেরিকান ইংরেজি হয়তো একদিন ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ভাষায় পরিণত হবে। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে ভিন্ন। প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও বৈশ্বিক যোগাযোগ দুই ধরনের ইংরেজিকে আরও কাছাকাছি এনে দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিনিয়ত নতুন শব্দ যোগ করে ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করছে।

আজ ইংরেজি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক ভাষা। আর সেই ভাষার বিকাশে আমেরিকান ইংরেজির অবদান অনস্বীকার্য। নতুন শব্দ, নতুন বানান ও নতুন প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিজস্ব ভাষাগত পরিচয়ই গড়ে তোলেনি, বরং ইংরেজিকে আরও বৈচিত্র্যময়, প্রাণবন্ত ও বৈশ্বিক ভাষায় পরিণত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

পূর্বের খবরসিনেমায় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক :দীপিকা-ক্যাটরিনাকেও ছাড়িয়ে গেলেন আলিয়া
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!