ডয়েসে ভেলে প্রতিবেদন : কিশোর-কিশোরীদের জন্য সোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধের ভালো-মন্দ

 

বিশেষ প্রতিবোদন

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-র সদ্য প্রকাশ করা জরিপ অনুযায়ী, স্কুল চলছে এমন দিনগুলোতে কম বয়সি ছেলে-মেয়েরা প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার ঘণ্টা এবং সপ্তাহান্তে ৬ ঘণ্টারও বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটায়৷

জরিপ নিয়ে করা প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, ইইউ অঞ্চলের প্রায় ১৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি সাতজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে একজন জানিয়েছে, সাধারণ অবস্থায় তারা স্ক্রিনের সামনে দিনে অন্তত ৮ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় কাটায়, শনি ও রবিবারে সেই সময় আরো বেড়ে দিনে ১০ ঘণ্টাও ছাড়িয়ে যায়৷

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে দৈনন্দিন জীবনে স্ক্রিন-টাইমের প্রভাব সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়েছিল৷ জবাবে ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছে, তারা মনে করে, মোবাইল, ল্যাপটপ কিংবা ট্যাব-এর পর্দায় বেশিক্ষণ চোখ রাখা ভালো, অর্থাৎ, তাদের মতে, এর প্রভাব ইতিবাচক৷ এর বিপরীতে মাত্র ২৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী মনে করে, তাদের জীবনে স্ক্রিনের সামনে বেশি সময় কাটানোর অভ্যাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে৷

জরিপে অংশ নেয় মূলত ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সিরা৷ তাদের প্রায় অর্ধেকই বলেছে, তারা মনে করে, জীবনে সোশাল মিডিয়া ভালো প্রভাব রাখবে৷ ৪৮ শতাংশের মতে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে সোশাল মিডিয়ার প্রভাব ইতিবাচক৷

তবে জরিপে অংশ নেয়াদের মাঝে অনেক ভিন্নমতও দেখা গেছে৷ প্রতি তিনজন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে প্রায় একজন জানিয়েছে, সোশাল মিডিয়ার কারণে তারা বিষণ্নতা ও মানসিক চাপে ভুগছে, কিংবা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করেছে৷ প্রায় ৪০ শতাংশ জানিয়েছে, সোশাল মিডিয়ায় বেশি থাকার কারণে তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে বা ঘুমাতে সমস্যা হয়৷

সোশাল মিডিয়ায় কিশোর-কিশোরীদের নানা ধরনের ‘ক্ষতিকর’ কন্টেন্ট দেখা নিয়ে সমাজে যে উদ্বেগ রয়েছে, জরিপের ফলাফল বলছে, সেই উদ্বেগ অমূলক নয়৷ কারণ, জরিপে অংশ নেয়া ইউরোপের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি জানিয়েছে, সোশাল মিডিয়ায় তারা মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখে৷ এক-চতুর্থাংশ জানিয়েছে, সোশাল মিডিয়ায় তারা বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের শিকার হয়, আর প্রায় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন জানিয়েছে, সোশাল মিডিয়ায় তারা অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংস কন্টেন্ট দেখেছে৷ স্ক্রিন-টাইম এবং সোশাল মিডিয়া ব্যবহারের পার্থক্য

তবে ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তানিয়া নটলি মনে করেন, কিশোর-কিশোরীদের মানসিকভাবে খারাপ থাকার সঙ্গে সোশাল মিডিয়া ব্যবহারের সরাসরি যোগসূত্র না খোঁজাই ভালো৷ এ বিষয়ে সতর্ক করে ডিজিটাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ তানিয়া ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এই জরিপের কোনো গবেষণাতেই মানসিক স্বাস্থ্য এবং সোশাল মিডিয়ার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি৷ আমি মনে করি, বিষয়টি এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও সূক্ষ্ম৷” তিনি আরো বলেন, নীতিনির্ধারকদের উচিত কিশোর-কিশোরীদের স্ক্রিনের সামনে সময় কাটানো এবং সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা৷ এমন মতামতের ব্যাখ্যায় তানিয়া নটলি বলেন, ‘‘আমরা যখন স্ক্রিন টাইম বা স্ক্রিনের সামনে কাটানো সময়ের কথা বলি, তখন বিষয়টি অনেক ব্যাপক হয়ে যায়৷ এর মধ্যে যেমন টেলিভিশনের সামনে কাটানো সময় থাকে, তেমনি হোমওয়ার্ক করার সময়টুকুও থাকে৷ তাই সামগ্রিক স্ক্রিন টাইমের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখা বেশি কার্যকর৷”

কিশোর-কিশোরীদের সোশাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টিতেও আলোকপাত করেছে ইইউর জরিপ৷ জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেকই সোশাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতি বিদ্যমান নিয়ম-কানুন আরো কঠোরভাবে কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে৷ অন্যদিকে ৪৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছে, এ বিষয়ে আরো বেশি সচেতনতামূলক শিক্ষা প্রয়োজন৷ আবার জরিপে অংশ নেয়া কিশোর-কিশোরীদের প্রায় অর্ধেকই জোর দিয়েছে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ এবং বয়সসীমা নির্ধারণের ওপর৷

 

আইনি বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে সোচ্চারদের অন্যতম যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা প্যারেন্টস অ্যাগেইনস্ট ফোন অ্যাডিকশন ইন ইয়াং অ্যাডোলেসেন্টস (পাপায়া)-র প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সুজি ডেভিস৷ কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাবের বিষয়ে উদ্বিগ্ন তিনি৷ এ কারণে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধের পক্ষে৷ তিনি বলেন, ‘‘আধুনিক প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি, যার ফলে আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিনভিত্তিক সন্তুষ্টির অনুভূতি জাগানোর প্রক্রিয়া উদ্দীপ্ত হয়৷ ফলে আমরা সবাই অতিরিক্ত ব্যবহার এবং এক ধরনের বাধ্যতামূলক আসক্তির ঝুঁকিতে পড়ে যাই৷” তাই সুজি ডেভিস মনে করেন, ডিজিটাল বিশ্বের বাস্তবতার নিরিখে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করা দরকার, কারণ, ‘‘কিশোর-কিশোরীরা এক্ষেত্রে বিশেষ ঝুঁকির মুখে থাকে৷ কারণ, তাদের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা কিনা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং আবেগীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে, তখনও তা পুরোপুরি গঠন-প্রক্রিয়ায় থাকে৷ যৌবনের শুরু পর্যন্ত চলতে থাকে এর বিকাশ৷”

গত জুন মাসে বড় এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য৷ এক ঘোষণায় দেশটি জানিয়েছে, ২০২৭ সালের বসন্ত থেকে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে৷ এক্ষেত্রে আরো এগিয়ে অস্ট্রেলিয়া৷ গত ডিসেম্বরেই দেশের সব অপ্রাপ্তবয়স্কের জন্য সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে তারা৷ নরওয়ে এবং ক্যানাডাসহ বেশ কিছু দেশ ইতিমধ্যে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে কাজ করছে৷

ইইউর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী৷ এর ফলে ইইউ অঞ্চলে ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট ও ডিজিটাল ফেয়ারনেস অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা সম্ভব হয়েছে৷ তবে ইইউর কয়েকটি সদস্য দেশ আরো কঠোর পদক্ষেপ দাবি করছে৷

জাতীয় পর্যায়ে কিশোর-কিশোরীদের জন্য সোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস, অস্ট্রিয়া এবং ডেনমার্ক৷ তারা চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়েই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হোক৷ জার্মানিতে সরকার-নিযুক্ত একটি কমিশন সম্প্রতি ১৩ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশাল মিডিয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধের সুপারিশ করেছে৷

এমন পদক্ষেপের দাবি জোরালো হওয়ায় ইতিমধ্যে অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ক একটি স্বাধীন প্যানেল গঠন করেছে কমিশন৷ আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই প্যানেল প্রতিবেদন জমা দেবে৷ তারপর পরবর্তী করণীয় স্থির করবে কমিশন৷

নিষেধাজ্ঞায় হিতে বিপরীতের শঙ্কা

ইউরোপিয়ান ইয়ুথ ফোরামের প্রেসিডেন্ট রারেস ভইকু ঢালাওভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিপক্ষে৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, নিষিদ্ধ করার এই প্রবণতা খুবই সরলীকৃত বিষয়৷ এটি শিশু, কিশোর বা সামগ্রিকভাবে কম বয়সিদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের জটিল দিকগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয় না৷” সমকালীন বাস্তবতায় সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়া এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে৷ বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের কাছে অনলাইন জগত এখন খবর পাওয়ার এবং বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা বা যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম৷”

সোশ্যাল মিডিয়া ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সহ-লেখক, অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের ডিকিন ইউনিভার্সিটির রিসার্চ ফেলো নন্দী বিজয়কুমারও মনে করেন সোশাল মিডিয়ার ইতিবাচক দিকগুলোকে এ যুগে অগ্রাহ্য করা অনুচিত৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘এখন তো অনেক কিছুই অনলাইনে ঘটছে৷ এটা কিশোর-কিশোরীদের নিজস্ব সত্তা গড়ে তুলতে, বন্ধুদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে সহায়তা করে৷ অনেক কিশোর-কিশোরী তো অনলাইনে এমন সব কমিউনিটির সন্ধান পায়, যা হয়তো অফলাইনে বা বাস্তব জীবনে জে পাওয়া সহকে সম্ভব হতো না৷”

ইউরোপিয়ান ইয়ুথ ফোরামের প্রেসিডেন্ট রারেস ভইকু মনে করেন, ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার ফলাফল আগেই ভেবে দেখা জরুরি৷ তিনি বলেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়ায় আর সময় কাটাতে না পারলে তখন কী করবে তারা? এমন কিছু কার্যক্রমের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যা সোশ্যাল মিডিয়ার মতোই পারস্পরিক সম্পৃক্ততার অনুভূতি গড়ে তুলতে সক্ষম৷”

ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তানিয়া নটলি মনে করেন, কিশোর-কিশোরীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ করা হলেও অস্ট্রেলিয়ার এই পরীক্ষামূলক পদক্ষেপটি সফল হয়েছে কিনা তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না, কারণ, এটি ‘‘একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নীতি এবং এর পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ নেই৷”

তানিয়া নটলি আরো বলেন, কেবল অন্ধভাবে অনুসরণ না করে অন্য দেশগুলোর উচিত পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেয়া, বিদ্যমান বিধিনিষেধগুলো পর্যালোচনা করা এবং ডিজিটাল মিডিয়ার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া৷ তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়ার সোশ্যাল মিডিয়া-নিষেধাজ্ঞা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামগ্রিক সুস্থতা ও নিরাপত্তার ওপর কোনো পরিমাপযোগ্য প্রভাব ফেলছে কি না তা নিয়ে প্রাথমিক গবেষণার ফলাফল এ বছরের শেষের দিকে প্রকাশিত হবে৷ তাই কিশোর-কিশোরীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধে আগ্রহী দেশগুলোর প্রতি তার পরামর্শ, ‘‘তারা যেন একটু সময় নেয় এবং সেই গবেষণার ফলাফলটি পর্যালোচনা করে দেখে,” কারণ, এমন নিষেধাজ্ঞা ‘‘কিশোর-কিশোরীদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে৷”

পূর্বের খবরপ্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠা ‘রিভেঞ্জ ড্রেস’: ৩২ বছর পরও অনুপ্রেরণার নাম ডায়না
পরবর্তি খবরভারত-বাংলাদেশ ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক, তবে আমরা প্রস্তুত: ভারতীয় রেল
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!