বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ ডেস্ক : ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হলেই ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটি প্রশ্ন নতুন করে জেগে ওঠে-১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ ভারত কেন এখনও ফুটবল বিশ্বকাপে খেলতে পারে না? ক্রিকেটের বাইরে ফুটবলের জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বমঞ্চে ভারতের অনুপস্থিতি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।
পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও গোয়ার মতো রাজ্যগুলোতে বিশ্বকাপ ঘিরে বিপুল উন্মাদনা দেখা যায়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা পর্তুগালের সমর্থনে রাস্তাজুড়ে পোস্টার, পতাকা ও বিশাল কাটআউট চোখে পড়ে। কিন্তু সেই আবেগ এখনো ভারতের জাতীয় দলকে বিশ্বকাপের মঞ্চে তুলতে পারেনি।
ভারতের সাবেক অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়ার মতে, বিশ্বকাপে খেলা অসম্ভব নয়, তবে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক পরিশ্রম প্রয়োজন। তিনি বলেন, ভারতের মতো বিশাল দেশে প্রতিভার অভাব নেই। অভাব রয়েছে সঠিক পরিবেশ, তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার।
ভারতের ফুটবলের আরেক কিংবদন্তি শ্যাম থাপাও একই মত পোষণ করেন। তাঁর মতে, শিশুদের মধ্যে ফুটবল খেলার আগ্রহ বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক অভিভাবক সন্তানদের ফুটবলের বদলে ক্রিকেটের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। আইপিএলের বিপুল আর্থিক আকর্ষণও এর একটি বড় কারণ। শ্যাম থাপার ভাষায়, ফুটবল থেকেও সফল ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব-এ বিষয়টি মানুষকে বোঝাতে হবে।
ভারতের পিছিয়ে থাকার চিত্র ফুটে ওঠে বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও। ২০২৬ বিশ্বকাপে এশিয়া থেকে যে নয়টি দল জায়গা করে নিয়েছে, তাদের মধ্যে নতুন মুখ জর্ডান ও উজবেকিস্তানও রয়েছে। অথচ ভারত বর্তমানে ১৩৬তম স্থানে অবস্থান করছে। তুলনায় উজবেকিস্তান ৫২তম এবং জর্ডান ৬৩তম স্থানে রয়েছে। এই ব্যবধানই ভারতীয় ফুটবলের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের গভীরতা তুলে ধরে।
ভারতীয় ফুটবলের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০২২ সালে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) সভাপতি হিসেবে সাবেক ফুটবলার কল্যাণ চৌবে দায়িত্ব নেন। তিনি ভারতকে অল্প সময়ে বিশ্বকাপে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি না দিয়ে ধাপে ধাপে উন্নতির কথা বলেছিলেন। কিন্তু চার বছর পরও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দৃশ্যমান নয় বলে সমালোচকদের অভিযোগ।
একসময় ভারতীয় ফুটবলের বড় আশা ছিল ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল)। বলিউড, ব্যবসা ও ক্রীড়াজগতের তারকাদের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তুলবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক ও সাংগঠনিক সংকটের কারণে আইএসএলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। স্পন্সর সংকট, মৌসুম বিলম্বিত হওয়া এবং খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ফুটবলের সামগ্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তবে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। এআইএফএফ বর্তমানে এমন নীতিগত পরিবর্তনের চেষ্টা করছে, যাতে বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলাররা সহজে ভারতের হয়ে খেলতে পারেন। বর্তমানে বিদেশি পাসপোর্টধারী খেলোয়াড়দের ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে হলে তাদের অন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। নিয়ম শিথিল হলে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বাড়বে।
ভারতীয় ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় সুনীল ছেত্রীও বাস্তববাদী লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত নিয়মিত এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা এবং শক্তিশালী এশীয় দলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। এশিয়ার শীর্ষ ১৫-২০ দলের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই কেবল বিশ্বকাপের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ভারতের বিশ্বকাপ-স্বপ্ন এখনো অনেক দূরের পথ। জনসংখ্যা, জনপ্রিয়তা কিংবা আবেগ নয়-বিশ্বকাপে পৌঁছাতে প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা, শক্তিশালী অবকাঠামো, তৃণমূল উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। সেসব বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বকাপ দেখবেন দর্শক হিসেবেই, আর অপেক্ষা করবেন সেই দিনের জন্য, যেদিন ব্লু টাইগাররা নিজেরাই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নামবে।




