যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে। তবে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দুই দেশ এখনো চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছায়নি, যদিও আলোচনা “খুব কাছাকাছি” অবস্থানে রয়েছে। বিবিসির এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কখন বা আদৌ কোনো চুক্তি হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।”
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য এই চুক্তির আওতায় অন্তত ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হতে পারে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। বৃহস্পতিবার মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, দুই দেশ একটি প্রাথমিক কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং এখন শুধু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদনের অপেক্ষা চলছে। তবে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, আলোচনাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ভাইস-প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় এখন সবচেয়ে জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রশ্নটি। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে ইরানকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন বন্ধ করতে হবে এবং তাদের বিদ্যমান মজুদও নিষ্পত্তি করতে হবে। কারণ এই ধরনের ইউরেনিয়াম তাত্ত্বিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে। ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস ইরান “সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই” আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।
গত ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির পর থেকেই ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন যে দুই দেশ একটি বড় ধরনের সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র রাষ্ট্রগুলো, যুদ্ধবিরোধী ডেমোক্র্যাট নেতারা এবং এমনকি কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও এই সংঘাত দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানাচ্ছেন।
সম্ভাব্য চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে ইতোমধ্যে নানা তথ্য সামনে এসেছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরানকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ করতে হতে পারে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ অবরোধ শিথিল করবে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হতে পারে, যাতে দেশটি আবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি করতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ট্রাম্পকে ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। তবে তিনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টি আরও কয়েক দিন পর্যালোচনা করবেন। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি অনানুষ্ঠানিক ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে বলা হয়, ওয়াশিংটনের আরোপিত বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের আশপাশের অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক চলাচল পুনরুদ্ধারের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। যদিও হোয়াইট হাউস এই তথাকথিত খসড়াকে “সম্পূর্ণ মনগড়া” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথের অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার দিকে গভীর নজর রাখছে।
তবে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নাজুক। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর দাবি করেছে, দক্ষিণ ইরানে নতুন মার্কিন হামলার জবাবে তারা অঞ্চলের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। একই সঙ্গে ইরানি গণমাধ্যম একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করে। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এসব দাবি অস্বীকার করে জানিয়েছে, “কোনো মার্কিন বিমান ভূপাতিত হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব আকাশযান নিরাপদ রয়েছে।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সম্ভাব্য সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালেও এখনো বহু জটিল ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে ঐকমত্য হয়নি। তাই চুক্তি নিয়ে আশাবাদ থাকলেও পরিস্থিতি যে কোনো সময় নতুন মোড় নিতে পারে।
-বিবিসি প্রতিবেদন




