ভিনিউজ : গাজা উপত্যকায় টানা দুই বছর ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধের সময় শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বশাসিত অঞ্চল ইসরাইলকে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা । কয়েক মাসব্যাপী অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালতের সতর্কবার্তা এবং বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিবাদের পরও ইসরাইলের কাছে সামরিক সহায়তা পৌঁছানো বন্ধ হয়নি।
প্রতিবেদন তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে ইসরাইলি কর কর্তৃপক্ষের ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমদানি তথ্য, শুল্ক নথি এবং তথ্য অধিকার আইনের আওতায় সংগ্রহ করা বিভিন্ন সরকারি দলিল। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধ চলাকালে ইসরাইলে মোট ২ হাজার ৬০৩টি সামরিক চালান প্রবেশ করেছে। এসব চালানের আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন শেকেল, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ৮৮ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের সমান।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সামরিক সরঞ্জামের ৯১ শতাংশই ইসরাইলে পৌঁছেছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে International Court of Justice বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত গাজায় গণহত্যার আশঙ্কা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারির পর। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আদালত সতর্ক করার পরও অস্ত্র সরবরাহের ধারা কমেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইলের কাছে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র। এর মধ্যে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র মোট সামরিক আমদানির ৪২ শতাংশের বেশি সরবরাহ করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারত দিয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। ভারতের বিভিন্ন বেসরকারি ও যৌথ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইসরাইলি বাহিনীর জন্য ভারী কামানের গোলার খোলস, বিস্ফোরক উপাদান এবং অতিরিক্ত শক্তি সৃষ্টিকারী দাহ্য পদার্থ সরবরাহ করেছে বলে শুল্ক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে ইসরাইলের মোট অস্ত্র আমদানির প্রায় ১৯ শতাংশ জুগিয়েছে। স্পেন, কানাডা, ফ্রান্স এবং ইতালির মতো কয়েকটি দেশ রাজনৈতিকভাবে ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করলেও বাস্তবে তাদের ভূখণ্ড থেকে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো বন্ধ হয়নি। নতুন অনুমতি স্থগিতের ঘোষণা দিলেও পুরোনো অনুমোদনের অজুহাতে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কোটি কোটি টাকার সামরিক সরঞ্জাম ইসরাইলে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফিলিস্তিনের পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরব থাকা তুরস্ক ও ব্রাজিল থেকেও যুদ্ধের শুরুর দিকে প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট খুচরা যন্ত্রাংশ ইসরাইলে প্রবেশ করেছে। যদিও তুরস্ক ২০২৪ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্য বন্ধ ঘোষণা করে, পরে অন্য বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে তুর্কি পণ্য ইসরাইলে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সতর্কবার্তার পরও যেসব দেশ ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, তারা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গণহত্যা প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব শুধু গণহত্যা ঠেকানো নয়, বরং গণহত্যার ঝুঁকি তৈরি হলে তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। ফলে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সহযোগিতা বা উসকানি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।




