ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন বন্ধ এক বছর

দেশে এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন। বছরে দুবার এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও গত দুই বছরে হয়েছে দুবার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত কৌশলগত পরিকল্পনা বা ওপির মাধ্যমে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুল কেনা ও বিতরণ হতো। এরপর নতুন ওপি না হওয়ায় এই ক্যাপসুল কেনা হয়নি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন হয় আগের কেনা ক্যাপসুল দিয়ে।

পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিটামিন এ শিশুদের রাতকানা রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও সংক্রমণজনিত ঝুঁকি বাড়তে পারে। বর্তমানে প্রাদুর্ভাব ঘটা হামও সংক্রামক রোগ।

শিশুদের অন্ধত্ব ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে ১৯৭৩ সাল থেকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়। তখন এটি ‘জাতীয় রাতকানা রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম’ নামে পরিচালিত হতো। ১৯৯৫ সাল থেকে কার্যক্রমটি আরও শক্তিশালী করতে জাতীয় টিকাদান দিবসের সঙ্গে ভিটামিন এ বিতরণ যুক্ত করা হয়। স্বতন্ত্র ও সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করতে ২০০৩ সাল থেকে এর নাম দেওয়া হয় ‘জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন’। ২০১১ সালে এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় পুষ্টিসেবা (এনএনএস) কার্যক্রমের অধীনে আরও বিস্তৃতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শিশুদের পুষ্টি ও অন্ধত্ব দূরীকরণে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন এবং জাতীয় কৃমিনাশক সপ্তাহ পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। কারণ, শরীরে কৃমি থাকলে ভিটামিন এ-র পূর্ণ শোষণ বাধাগ্রস্ত হয়। ২০০৩ সাল থেকে ভিটামিন এ ক্যাপসুলের সঙ্গে কৃমিনাশক ট্যাবলেট যুক্ত করা হয়। তবে গত দুই বছর নিয়মিত কৃমিনাশক সপ্তাহ পালন করা হয়নি।

৬ মাস পরপর ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬-১১ মাস বয়সী শিশুকে নীল রঙের এবং ১২-৫৯ মাস বয়সী শিশুকে লাল রঙের ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো। প্রতিবার গড়ে সোয়া ২ কোটি শিশুকে এই ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন হয়। সে সময় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সোয়া ২ কোটি শিশুকে এই ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে এই ক্যাম্পেইন হয়েছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বে প্রাক্‌- বিদ্যালয় বয়সী প্রায় ১৯ কোটি শিশু ভিটামিন এ ঘাটতির ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের অধিকাংশই আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার। ভিটামিন এ-এর অভাবে দৃষ্টিশক্তি সমস্যা থেকে শুরু করে গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্ব এবং সংক্রমণজনিত রোগ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে হাম ও ডায়রিয়ার জটিলতা বেড়ে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, দেশের স্বাস্থ্য খাতের অধিকাংশ অবকাঠামো ও সেবা—যেমন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতালের সেবা ব্যবস্থাপনা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকা ও পুষ্টি কার্যক্রমসহ ৩০টির বেশি উদ্যোগ ১৯৯৮ সাল থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি ওপির (অপারেশনাল প্ল্যান) মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সর্বশেষ ওপি বা ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি)’ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়। এরপর ১ লাখ ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকার পঞ্চম এইচপিএনএসপি অনুমোদন হয়নি। ২০২৫ সালের মার্চে কর্মসূচিটি বাতিল করে রাজস্ব খাতের মাধ্যমে সব কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এতে এইচপিএনএসপির পরিবর্তে খাতভিত্তিক কর্মসূচিগুলোকে নিয়মিত কর্মসূচির সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে প্রকল্প অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দে বিলম্ব ও জটিলতা দেখা দেয়।

জাতীয় পুষ্টিসেবার সাবেক দুজন উপ-প্রকল্প ব্যবস্থাপক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ওপির মাধ্যমে ভিটামিন এ ক্যাপসুল সংগ্রহ, সংরক্ষণ, মাঠপর্যায়ে বিতরণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রচার করা হতো। নতুন ওপি না থাকায় এবং ২০২৪ সালের জুনের পর অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কাঠামো না থাকায় পুরো ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের ক্যাম্পেইন হয়েছে আগে কেনা ক্যাপসুল দিয়ে।

ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকার প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিটামিন এ একটি ফ্যাট-সলিউবল ভিটামিন, যা শরীরে চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সঞ্চিত থাকে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার হয়। মানবদেহ নিজে ভিটামিন এ তৈরি করতে পারে না এবং খাদ্যাভ্যাসে ঘাটতির কারণে অনেক শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। ফলে পরিপূরক হিসেবে প্রতি ছয় মাস পর এই ক্যাম্পেইন করা হয়। ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকলে তাৎক্ষণিক বড় কোনো ক্ষতি না দেখা গেলেও ধীরে ধীরে শিশুদের পুষ্টিহীনতা দেখা দেয় ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। তাঁরা বর্তমানে হামের প্রকোপ বৃদ্ধিকে সম্ভাব্য একটি ইঙ্গিত মনে করছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মঞ্জুর আল মুর্শেদ চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ভিটামিন এ শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্যাম্পেইন ব্যাহত হলে দীর্ঘ মেয়াদে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও সংক্রমণজনিত ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই সময়মতো ও ধারাবাহিকভাবে ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন নিশ্চিত করা জরুরি।

জাতীয় পুষ্টি সেবার সর্বশেষ লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. আঞ্জুমান আরা সুলতানা বলেন, ‘ওপি বন্ধ হওয়ায় ক্যাম্পেইন করা যায়নি। ২০২৫ সালের ক্যাম্পেইনের ক্যাপসুল আগের ওপি থাকাকালীন কেনা হয়েছিল। সে সময় পরিচালন ব্যয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাদ্দ থেকে মেটানো হয়। সেক্টর কর্মসূচি না থাকায় জাতীয় পুষ্টি সেবা বা এনএনএস বিলুপ্ত হয়।’

সূত্র জানায়, কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন পরিচালনার কথা ছিল। গত বছরের শেষে একটি ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা থাকলেও বরাদ্দ অনুমোদন, অর্থসংকট এবং ক্যাপসুল কেনায় জটিলতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।

এ বিষয়ে আইপিএইচএনের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, ‘রাজস্ব খাত থেকে ক্যাম্পেইন চালানোর কথা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যে বাজেট বরাদ্দ আসে, সেখান থেকে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার ক্যাপসুল কিনবে। তবে দরদাতারা অস্বাভাবিকভাবে বেশি দর দেওয়ায় দুটি দরপত্রপ্রক্রিয়া বাতিল করতে হয়েছে। তৃতীয় দরপত্রের কার্যক্রম শেষে বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সিএমএসডি ক্যাপসুল সরবরাহ করলে ক্যাম্পেইন চালানো হবে।’

পূর্বের খবরবগুড়া সিটি করপোরেশন উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
পরবর্তি খবরবাংলাদেশের স্পিন চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে প্রস্তুত নিউজিল্যান্ড
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!