বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন–ইসরায়েল জোটের মধ্যে চলমান সংঘাত আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। একাধিক দেশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত, যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের প্রস্তুতি এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
ওমান জানিয়েছে, নতুন করে হামলার উদ্দেশ্যে পাঠানো তিনটি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ধোফার এবং সালালাহ বন্দরের কাছে ড্রোনগুলো শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়। এর আগে দুকম বন্দরের একটি জ্বালানি ট্যাঙ্কেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে, যদিও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পরিচিত ওমানও এখন সরাসরি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ইরানের রাজধানী তেহরানেও নতুন করে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। Israel Defense Forces (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে, তারা ইরানের একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং একজন শীর্ষ কমান্ডারকে লক্ষ্য করা হয়েছে। একইসঙ্গে ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ভবনে গোলাবর্ষণ করেছে। এমনকি আইডিএফের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei নিজ কম্পাউন্ডে নিহত হয়েছেন-যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্যাটেলাইট চিত্রে মধ্য ইরানের Natanz Nuclear Facility-এ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। তিনটি ভবনে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেলেও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পায়নি বলে জানিয়েছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো ভূগর্ভস্থ জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কমপ্লেক্সের প্রবেশপথের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, মার্কিন–ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭৮৭ জন নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থার দাবি, নিহতদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক নাগরিক ও শিশু রয়েছে। তেহরান, বুশেহর, উর্মিয়া, ইসফাহান ও কেরমানসহ বিভিন্ন শহরে হামলা অব্যাহত রয়েছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও আঘাতের অভিযোগ উঠেছে, যদিও আইডিএফ হাসপাতাল লক্ষ্য করে হামলার কথা অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে লেবাননেও হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নিতানেহু স্থল অভিযানের অনুমোদন দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ গোলান উপত্যকা ও উত্তর ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে।
সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপেও। সাইপ্রাসে সেনাঘাঁটিতে ড্রোন হামলার পর যুক্তরাজ্য ভূমধ্যসাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কথা ভাবছে। ব্রিটিশ রয়েল নেভির এইচএমএস ডানকান প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্যাম্প যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার ষ্টারমার্ক এর সমালোচনা করে বলেছেন, যুক্তরাজ্য প্রত্যাশিত সহায়তা দেয়নি এবং দুই দেশের সম্পর্ক আগের মতো নেই।
মানবিক পরিস্থিতিও ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর প্রথমবারের মতো গাজা ক্রসিং খুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে খাদ্য ও ওষুধসহ জরুরি সহায়তা প্রবেশ করতে পারে। জাতিসংঘ আগে সতর্ক করেছিল, ত্রাণ প্রবেশ বন্ধ থাকলে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ থেকে তাদের নাগরিকদের অবিলম্বে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কুয়েতে মার্কিন দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কাতার মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়িয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ইরান বনাম মার্কিন–ইসরায়েল সংঘাত এখন কেবল সীমিত সামরিক মোকাবিলা নয়; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং মানবিক পরিস্থিতিকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছেই।




