১৯৭১ এর ২৫ মার্চ: ঢাকায় অপরেশন সার্চলাইট, প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ

 

জয়ন্ত আচার্য

ভিনিউজ :১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত ঢাকার ইতিহাসে শুধু একটি দিন নয়, এটি ছিল বাঙ্গালির স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্খার বিরুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর সর্বাত্মক আক্রমণের সূচনা। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালি জাতির গণতান্ত্রিক অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে যে নৃশংস সামরিক অভিযান শুরু করে, তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচিত। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকাসহ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে একযোগে আঘাত হেনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী ও বাঙালি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিশ্চিহ্ন করে পাকিস্তান সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং ৫৭ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ২২ ফেব্রুয়ারিতে এই সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। ১৭ মার্চ চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় ঢাকা সেনানিবাসে, যা রাও ফরমান আলী নিজ হাতে লিখেছিলেন। এই পাঁচ পৃষ্ঠার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন তদারকির জন্য লে. জেনারেল টিক্কা খান ঢাকায় অবস্থান করেন এবং ইয়াহিয়া খানের ঘনিষ্ঠ দুই সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ইখতেখার জানজুয়া ও মেজর জেনারেল এ. ও. মিঠঠিকেও ঢাকায় আনা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকায় অভিযানের নেতৃত্ব দেবেন রাও ফরমান আলী এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নেতৃত্ব দেবেন খাদিম হোসেন রাজা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ মার্চ রাত একটায় অভিযান শুরু কথা থাকলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। বঙ্গবন্ধু সেই সন্ধ্যায় জাতিকে সর্বাত্মক সংত্রামের জন্য প্রস্তত থাকার আহ্বান জানান। পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করে যে বাঙালি প্রতিরোধ সংগঠিত হয়ে উঠতে পারে, ফলে অভিযান এগিয়ে এনে ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকায় কারফিউ জারি করা হয় এবং ঠিক সেই সময় থেকেই শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ।

রাত ১১টা ৩০ মিনিটে পাকিস্তানি সেনারা সেনানিবাস থেকে বের হয়ে ফার্মগেটে মিছিলরত নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গুলি চালিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের সূচনা করে। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী একযোগে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পুরনো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আক্রমণ চালানো হয়। রাত দেড়টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের কেন্দ্র। তাই অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। ট্যাংক, মর্টার, রকেট লঞ্চার ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তর দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে ফেলে। ইকবাল হল (বর্তমান জহরুল হক হল), জগন্নাথ হলসহ আবাসিক এলাকায় নির্বিচারে গোলাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণ করা হয়। এই হত্যাযজ্ঞে অধ্যাপক ফজলুর রহমান, জি. সি. দেব, আব্দুল মুক্তাদির, ড. মনিরুজ্জামানসহ বহু শিক্ষক ও শত শত ছাত্র প্রাণ হারান। বিশেষভাবে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাত্রদের আবাস জগন্নাথ হলে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালানো হয়। আক্রান্ত হয় মেয়েদের রোকেয়া ও শামসুন্নাহার। নির্যাতনের শিকার হয় হলের আবাসিক মেয়েরা । ২৫ মার্চ কাল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।

একই রাতে পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ চালালে ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হয়। মাত্র ৩০৩ রাইফেল হাতে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা ট্যাংক, কামান ও মর্টার সজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পুলিশ বেতার মারফত সারাদেশে বার্তা পাঠানো হয় ডব ধৎব ধষৎবধফু ধঃঃধপশবফ নু ঃযব চধশ অৎসু. ঞৎু ঃড় ংধাব ুড়ঁৎংবষাবং.” রাত তিনটা পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে বহু পুলিশ শহীদ হন, অনেকে গেরিলা কৌশলে প্রতিরোধ চালিয়ে যান। রাজারবাগের এই প্রতিরোধই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ।

ঢাকার অন্যান্য এলাকাতেও একইসঙ্গে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। পুরনো ঢাকা, তেজগাঁও, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগানসহ বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়। রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে চালানো নৃশংসতা পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার চূড়ান্ত প্রকাশ। পুরোহিত পরমানন্দ গিরিকে কলেমা পড়তে বাধ্য করে বেয়নেট দিয়ে হত্যা করা হয় এবং নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়।

২৬ মার্চের ঢাকা ছিল এক স্তব্ধ, শোকার্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত নগরী। চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা, ধোঁয়া আর মৃতদেহ। টেলিফোন ও রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কারফিউ জারি, রাস্তা ঘাটে পাকিস্তানি সেনাদের টহল। জাহানারা ইমাম, সুফিয়া কামালসহ বহু প্রত্যক্ষদর্শীর ডায়েরিতে সেই দিনের আতঙ্ক, ধ্বংস ও অসহায়তার চিত্র উঠে এসেছে। বিদেশি সাংবাদিকদের দেশত্যাগে বাধ্য করায় সেদিনের প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা জানা যায়নি, তবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সূত্রে অনুমান করা হয় যে শুধু ঢাকাতেই সেই রাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন।

অপারেশন সার্চলাইট ছিল বাঙালি জাতিকে নেতৃত্বহীন ও ভীত করার একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা। কিন্তু এই হত্যাযজ্ঞ বাঙালিকে দমাতে পারেনি। বরং রাজারবাগ, পিলখানা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তা-ই পরবর্তীতে রূপ নেয় নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে। ঢাকার সেই কালরাত্রি আমাদের শোকের, আবার একই সঙ্গে আমাদের অহংকারের-কারণ সেই রাতেই বাঙালি জাতি অস্ত্র হাতে স্বাধীনতার পথে প্রথম দৃঢ় পদক্ষেপ রেখেছিল।

 

পূর্বের খবরটুঙ্গিপাড়া প্রতারণার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আ.লীগের প্রচার সম্পাদক গ্রেপ্তার
পরবর্তি খবরভয়াল সেই ২৫ মার্চ আঝ : মেলেনি গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি