ভিনিউজ প্রতিবেদন
কষা মাংস, চিকেন কোরমা কিংবা ডিমের তড়কা-সঙ্গে নরম, পাতলা রুমালি রুটি থাকলে বাঙালির রসনাতৃপ্তি যেন পূর্ণতা পায়। রেস্তরাঁ থেকে রাস্তার ধারের খাবারের দোকান, এমনকি অনেক বাঙালি বাড়ির রান্নাঘরেও এখন বেশ পরিচিত এই রুটি। কিন্তু জানেন কি, এই রুমালি রুটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজকীয় দরবারের ইতিহাস? একসময় যে পাতলা রুটিকে হাত মোছার কাজে ব্যবহার করা হত, সময়ের সঙ্গে সেটিই কী ভাবে পরিণত হল জনপ্রিয় খাবারে, তার গল্প বেশ চমকপ্রদ।
রুমালি শব্দটির উৎস ফার্সি ও উর্দু ‘রুমাল’ শব্দে। ‘রুমাল’ বলতে বোঝায় হাত মোছার কাপড়। রুমালি রুটির আকৃতি এতটাই পাতলা ও নরম যে দেখতে অনেকটা কাপড়ের টুকরোর মতো। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, মোগল দরবারে তেল, ঘি ও মশলাদার খাবার খাওয়ার পর হাত পরিষ্কার করার জন্য এই ধরনের পাতলা রুটি ব্যবহার করা হত। সেই কারণেই এর সঙ্গে ‘রুমাল’-এর তুলনা তৈরি হয়।
মোগল আমলের রাজকীয় ভোজে কবাব, কোর্মা, মাংসের নানা পদ এবং ঘন মশলাদার ঝোলের আধিক্য ছিল। সেই সব খাবার খাওয়ার পরে হাতে লেগে থাকা তেল বা ঘি পরিষ্কার করার প্রয়োজন হত। আধুনিক অর্থে টিস্যু বা ন্যাপকিনের ব্যবহার তখন ছিল না। ফলে পাতলা ও নরম রুটিই হয়ে উঠত হাত মোছার সহজ উপায়। তবে সময়ের সঙ্গে মানুষ বুঝতে শুরু করে, এই রুটি শুধু হাত মোছার জন্য নয়, বরং মাংসের ঝোল বা কোরমা শুষে খাওয়ার জন্যও দারুণ উপযোগী।
রুমালি রুটির ইতিহাস অবশ্য শুধু মোগল দরবারেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে পারস্য ও মধ্য এশিয়ার রুটি তৈরির ঐতিহ্যের যোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়। পারস্যের ‘থিরি’ কিংবা মধ্য এশিয়ার ‘মান্দা’-র মতো অতি পাতলা রুটির সঙ্গে রুমালি রুটির মিল খুঁজে পান খাদ্য-ইতিহাসবিদেরা। মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ফলে বিভিন্ন ধরনের রুটি তৈরির কৌশলও এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
রেশমপথ ধরে বণিক, পর্যটক ও যোদ্ধাদের যাতায়াতের সময় এই ধরনের পাতলা রুটি তৈরির কৌশল ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছেছিল বলেও একটি মত রয়েছে। দীর্ঘ যাত্রাপথে সহজে বহন করা যায় এবং দ্রুত সেঁকে নেওয়া সম্ভব-এমন খাবারের প্রয়োজন থেকেই অতি পাতলা রুটির জনপ্রিয়তা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। ভারতে এসে অবশ্য সেই রুটির চরিত্র বদলাতে থাকে। রাজদরবারের বাবুর্চিদের হাত ধরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় নানা কৌশল, পরিবেশন-পদ্ধতি এবং স্বাদের নতুন মাত্রা।
রুমালি রুটি তৈরির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল এর প্রস্তুতপ্রণালী। সাধারণ রুটির মতো মোটা করে বেলে তাওয়ায় সেঁকে নিলেই রুমালি রুটি তৈরি হয় না। আটার মণ্ডকে বিশেষ কায়দায় টেনে ও ছড়িয়ে অত্যন্ত পাতলা করা হয়। দক্ষ রাঁধুনিরা মণ্ডকে বাতাসে ঘুরিয়ে এমনভাবে ছড়িয়ে দেন যে সেটি প্রায় স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। এরপর উল্টানো কড়াই বা বিশেষ তাওয়ার উপর দ্রুত সেঁকে নেওয়া হয়।
রুটিটি যত পাতলা হবে, ততই তার স্বাদ ও গঠন আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ঠিকমতো তৈরি হলে রুমালি রুটি নরম, মোলায়েম এবং ভাঁজ করার মতো হয়। মাংসের ঝোল বা কোরমায় ডুবিয়ে খেলে সেটি খুব সহজেই ঝোল শুষে নেয়। এ কারণেই ভারী মশলাদার খাবারের সঙ্গে রুমালি রুটির জুটি এত জনপ্রিয় হয়েছে।
তবে রুমালি রুটির বাংলায় জনপ্রিয় হওয়ার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল অওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের কলকাতায় আগমন। ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশদের হাতে অওধের সিংহাসন হারিয়ে নির্বাসিত হয়ে কলকাতায় আসেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ। মেটিয়াবুরুজে তাঁর বসতি গড়ে ওঠে। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন অওধের রাজদরবারের বহু রাঁধুনি, খানসামা ও অন্য কর্মী। তাঁদের হাত ধরে কলকাতায় অওধি রান্নার বহু পদ নতুন করে পরিচিতি পায়।
এই সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের অংশ হিসেবেই রুমালি রুটিও বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে জায়গা করে নেয় বলে মনে করা হয়। মেটিয়াবুরুজকে ঘিরে অওধি রান্নার যে ঐতিহ্য তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব পরবর্তী সময়ে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বিরিয়ানি, কোরমা, কবাবের পাশাপাশি রুমালি রুটিও ধীরে ধীরে শহরের খাদ্যতালিকার পরিচিত অংশ হয়ে ওঠে।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে কলকাতা ও বাংলার বিভিন্ন এলাকায় রুমালি রুটির জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে থাকে। রেস্তরাঁর পাশাপাশি রাস্তার ধারের খাবারের দোকানেও দেখা যায় দক্ষ রাঁধুনিদের হাতে মণ্ড ঘুরিয়ে পাতলা রুটি তৈরির দৃশ্য। অনেক জায়গায় ক্রেতাদের চোখের সামনেই উল্টানো কড়াইয়ের উপর রুটি সেঁকে পরিবেশন করা হয়। ফলে খাবারের স্বাদের পাশাপাশি রুমালি রুটি তৈরি করাও হয়ে ওঠে এক ধরনের আকর্ষণীয় দৃশ্য।
বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে রুমালি রুটি অবশ্য কেবল মাংসের সঙ্গেই আটকে নেই। কষা মাংস, চিকেন, মাটন, কবাব, ডিমের তরকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন নিরামিষ পদ—সব কিছুর সঙ্গেই এটি মানিয়ে যায়। বিশেষ করে ঝোল বা গ্রেভি-যুক্ত খাবারের সঙ্গে রুমালি রুটির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি।
আজকের দিনে রুমালি রুটি আর শুধু রাজদরবারের স্মৃতি নয়। শহরের নামী রেস্তরাঁ থেকে পাড়ার ছোট খাবারের দোকান—সর্বত্রই তার উপস্থিতি। এমনকি বাড়িতেও অনেকে এটি তৈরির চেষ্টা করেন। যদিও পেশাদার রাঁধুনিদের মতো বাতাসে ঘুরিয়ে একেবারে পাতলা করা সহজ নয়, তবুও সামান্য অনুশীলনে ঘরোয়া পদ্ধতিতেও নরম ও পাতলা রুমালি রুটি তৈরি করা সম্ভব।
একসময় রাজাদের খাবারের টেবিলে হাত মোছার ‘কাপড়’ হিসেবে ব্যবহৃত একটি পাতলা রুটি কী ভাবে সময়ের স্রোতে নিজেই হয়ে উঠল খাবারের অন্যতম আকর্ষণ—রুমালি রুটির ইতিহাস তারই অনন্য উদাহরণ। মোগল দরবার থেকে অওধ, সেখান থেকে মেটিয়াবুরুজ এবং শেষ পর্যন্ত বাঙালির হেঁশেল ও রাস্তার খাবারের দোকান-রুমালি রুটির এই দীর্ঘ যাত্রা আসলে ভারতীয় উপমহাদেশের মিশ্র খাদ্যসংস্কৃতিরই এক সুস্বাদু গল্প।




