ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সাইট লাইনে মোদি-পুতিন বৈঠক: নজর আন্তর্জাতিক মহলের 

 

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ ডেস্ক: নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর আড়ম্বরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। তবে বহুপাক্ষিক এই সম্মেলন শুরুর আগের দিন, ১১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বৈঠককে ঘিরেই আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ। ভারত-রাশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এবারের বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র এবং রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমান নিয়ে দুই নেতার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্রিকস সম্মেলনের দুই দিনের কর্মসূচিতে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিষয়ও গুরুত্ব পাবে। প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী ১২ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার দিকে ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নেতারা সম্মেলনস্থলে পৌঁছাবেন এবং বৈঠক শুরু হবে। এরপর বহুপাক্ষিক আলোচনার অধিবেশন ও ‘ভারত ইনোভেটস’ প্রযুক্তি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। বিকেলে নেতাদের আনুষ্ঠানিক ছবি তোলা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বিশেষ নৈশভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বর সকালে সহযোগী ও পর্যবেক্ষক দেশগুলোর নেতারা সম্মেলনে যোগ দেবেন। সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক খোলা অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন নরেন্দ্র মোদি। ফলে ব্রিকসের আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি সম্মেলনের বাইরে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এর মধ্যেই ১১ সেপ্টেম্বর মোদি-পুতিন বৈঠককে সামনে রেখে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। ২০১৮ সালে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে পাঁচটি এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে চারটি ব্যবস্থা ভারত ইতিমধ্যে পেয়েছে এবং সেগুলো দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় মোতায়েন করা হয়েছে। বাকি ইউনিটটির সরবরাহ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়া তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে সক্ষম এবং সরবরাহ সম্পন্ন করার বিষয়ে তারা প্রস্তুত। ভারতের জন্য এস-৪০০ শুধু একটি অস্ত্র কেনার প্রকল্প নয়; এটি দেশটির বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বাকি ইউনিটের সরবরাহের সময়সূচি ও বাস্তবায়ন দুই দেশের প্রতিরক্ষা আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।

এর পাশাপাশি ভারত-রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুপারসনিক এই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এবার আলোচনায় আসতে পারে এর পরবর্তী প্রজন্মের সংস্করণ, অর্থাৎ ব্রহ্মোস-এনজি। রুশ পক্ষের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সময়ের সঙ্গে ব্রহ্মোসকে আরও আধুনিক করা, নতুন সক্ষমতা যুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। ফলে দুই দেশ শুধু নিজেদের সামরিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য নয়, তৃতীয় দেশের বাজারেও যৌথভাবে ব্রহ্মোসের অবস্থান শক্তিশালী করার কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে পারে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হতে পারে রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ বহুমুখী যুদ্ধবিমান এসইউ-৫৭। রুশ পক্ষ ইতিমধ্যে জানিয়েছে, বৈঠকে এই যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে ভারতের আগ্রহ কেবল যুদ্ধবিমান কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই নয়াদিল্লি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সরাসরি অস্ত্র আমদানির পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ গবেষণা এবং দেশে উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই দিক থেকে এসইউ-৫৭-এর প্রযুক্তি হস্তান্তর কিংবা যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হলে তা ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সম্পর্কের একটি নতুন পর্যায় সূচনা করতে পারে। রাশিয়ার দিক থেকেও শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কের পরিবর্তে যৌথ গবেষণা, সহ-উৎপাদন এবং তৃতীয় দেশে রপ্তানির মতো দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ রয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

মোদি-পুতিন বৈঠকের গুরুত্ব অবশ্য শুধু প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈঠকটি এমন এক সময়ে হতে যাচ্ছে যখন ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে ভারত বারবার অবস্থান নিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন এবং কূটনৈতিক আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। রাশিয়ার পক্ষ থেকেও আলোচনার জন্য প্রস্তুতির কথা জানানো হচ্ছে। ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়া নিয়েও দুই নেতার মধ্যে মতবিনিময় হতে পারে।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও ভারতের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করছে। জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা ভারতের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে হামলা ও পাল্টা হামলার কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক ভারতকে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে হয়। ফলে ব্রিকস সম্মেলনে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মতো বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে।

এদিকে দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার ভূরাজনীতিতেও নতুন সামরিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। পাকিস্তান ও মরক্কোর মধ্যে সামরিক সহযোগিতা জোরদার হওয়ার খবর সেই পরিবর্তনেরই একটি দৃষ্টান্ত। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় নিয়ে অগ্রগতি হচ্ছে। একই সময়ে চীন ও রাশিয়া ব্রিকস এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো বহুপাক্ষিক কাঠামোর মাধ্যমে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প সহযোগিতার পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ভারত এই দুই দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখার নীতি অনুসরণ করছে। ফলে নয়াদিল্লির জন্য রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই বাস্তবতায় ১১ সেপ্টেম্বরের মোদি-পুতিন বৈঠককে শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এস-৪০০-এর বাকি সরবরাহ, ব্রহ্মোসের নতুন প্রজন্ম, এসইউ-৫৭ যুদ্ধবিমান, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উৎপাদনের মতো বিষয়গুলোতে যদি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়, তাহলে তা ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের পরবর্তী দশকের রূপরেখা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে দুই নেতার অবস্থানও বৈশ্বিক কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে। সব মিলিয়ে ব্রিকসের মঞ্চে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি মোদি-পুতিন বৈঠক ভারত ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে নতুন প্রযুক্তি, যৌথ উৎপাদন ও কৌশলগত সহযোগিতার দিকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

-আজকাল অবলম্বনে

পূর্বের খবরড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠানকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দিতে হবে: হাইকোর্ট
পরবর্তি খবরবিরক্ত তারা সুতারিয়ার পাপারাৎজ়িরাদের উপর
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!