বেলুচিস্তান কোন পথে: বিদ্রোহ, স্বাধীনতার দাবি নাকি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত?

বিশেষ প্রতিবেদন

ভিনিউজ : পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ বেলুচিস্তান আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে। গত কয়েক সপ্তাহে প্রদেশটিতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ধারাবাহিক হামলা, পাল্টা সামরিক অভিযান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘স্বাধীন বেলুচিস্তান’ ঘোষণার দাবিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি যতই উত্তপ্ত হোক, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ বলছে-এ মুহূর্তে বেলুচিস্তানের স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত। বরং সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

আল জাজিরা, রয়টার্স, এপি এবং সিএনএনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চলতি বছর বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরুতে প্রদেশটিতে একাধিক বড় হামলায় কয়েক ডজন সেনা ও পুলিশ সদস্য নিহত হন। বিশেষ করে মাঙ্গি ড্যাম এলাকায় হামলার পর ইসলামাবাদ ‘অপারেশন শাবান’ নামে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। পাকিস্তানের দাবি, এ অভিযানে শতাধিক বিদ্রোহী নিহত হয়েছে। তবে এই সংখ্যার স্বাধীন কোনো আন্তর্জাতিক যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’-এর নামে একটি বিবৃতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং অঞ্চলটির অধিকাংশ ভূখণ্ড তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এমনকি নতুন জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মুদ্রা এবং প্রশাসনিক কাঠামো চালুর কথাও বলা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক কোনো রাষ্ট্র, জাতিসংঘ কিংবা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। পাকিস্তান সরকারও আনুষ্ঠানিকভাবে এ দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের বর্তমান সংঘাত নতুন নয়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে সেখানে বিদ্রোহ হয়েছে। তবে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নতুন মাত্রা পায়। বিশেষ করে বেলুচ লিবারেশন আর্মি (BLA), বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্ট (BLF) এবং আরও কয়েকটি সংগঠন পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী, অবকাঠামো এবং চীনের বিনিয়োগ প্রকল্পকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের অস্থিরতার মূল কারণ শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। প্রদেশটি পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় হলেও সবচেয়ে কম জনবহুল। এখানেই রয়েছে দেশের বিপুল গ্যাস, তামা, স্বর্ণ ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ। কিন্তু স্থানীয় বেলুচ জনগোষ্ঠীর অভিযোগ, এসব সম্পদ থেকে তারা ন্যায্য অংশ পাচ্ছে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নেও দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকারের দাবি, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো বিদেশি শক্তির সহায়তায় দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

চীনের অর্থায়নে গড়ে ওঠা গওয়াদর বন্দর এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC) প্রকল্পও বেলুচিস্তানকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো এগুলোকে ‘স্থানীয় সম্পদের ওপর বাইরের নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে দেখছে এবং হামলার লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।

সিএনএন-নিউজ১৮-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেলুচ নেতা মির ইয়ার বেলুচ দাবি করেছেন, এখন শুধু সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, সাধারণ জনগণের একাংশও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে। তাঁর মতে, পাকিস্তান ধীরে ধীরে স্থল নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে এবং বিমানশক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তবে এই দাবিরও স্বাধীন কোনো যাচাই এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, একটি অঞ্চল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে শুধু অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, কার্যকর প্রশাসন, স্থিতিশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অপরিহার্য। এখন পর্যন্ত বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রে এসব শর্তের কোনোটিই পূরণ হয়নি। বিশ্বের কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন জানায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী মাসগুলোতে পাকিস্তান সম্ভবত সামরিক অভিযান আরও জোরদার করবে। একই সঙ্গে বিদ্রোহী সংগঠনগুলোও গেরিলা হামলা অব্যাহত রাখতে পারে। ফলে সহিংসতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাই নয়, আফগানিস্তান, ইরান এবং আরব সাগরসংলগ্ন সামুদ্রিক বাণিজ্য পথেও প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে বেলুচিস্তান এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নতুন গতি পাচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু সামরিক সমাধান নয়, রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা পুনর্গঠনই পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে। অন্যথায় বেলুচিস্তানের সংকট আরও দীর্ঘ ও জটিল আকার ধারণ করবে, যার প্রভাব পাকিস্তানের সীমা ছাড়িয়ে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও পড়তে পারে।

পূর্বের খবররাজধানীতে শিক্ষার্থীদের ফের সড়ক অবরোধ
পরবর্তি খবররাত ১০টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে শাহবাগ ছাড়লেন শিক্ষার্থীরা
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!