ট্রাম্প-শি বৈঠক: সৌহার্দ্যের আড়ালে বড় চুক্তিহীন যুক্তরাষ্ট্র-চীন আলোচনা

 

ভিনিউজ : চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বহুল আলোচিত শীর্ষ বৈঠক শেষ হলেও প্রত্যাশিত বড় কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি হয়নি। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন, বাণিজ্য সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত সমন্বয় নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হলেও বাস্তব অগ্রগতির ক্ষেত্রে এখনো স্পষ্ট ফল দেখা যায়নি। তবে কূটনৈতিক সৌহার্দ্য, প্রতীকী বার্তা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ইঙ্গিত এই বৈঠককে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

বৈঠকের শুরু থেকেই দুই দেশের নেতারা পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য দেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে শি জিনপিংও দুই দেশের সহযোগিতাকে পারস্পরিক লাভজনক বলে মন্তব্য করেন। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক বৈঠকে উভয় নেতা শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দেন।

এই সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রযুক্তি ও শিল্প উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি। ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ইলন মাস্ক, আধুনিক অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান জেনসেন হুয়াং এবং উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কেলি অর্টবার্গ। তাদের উপস্থিতি থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য এই সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই উন্নত প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশ সীমিত করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চীনও নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে মরিয়া। ফলে দুই দেশের এই প্রতিযোগিতা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

তবে এত আলোচনার পরও বড় কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি হয়নি। দুই পক্ষ মূলত আগের বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার কথাই পুনর্ব্যক্ত করেছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ থেকে বিরত থাকবে এবং চীনও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করবে না বলে জানিয়েছে।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, দুই দেশ যৌথভাবে একটি বাণিজ্য পরিচালনা পরিষদ গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছে। এই পরিষদের মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন বাণিজ্যিক বিরোধ এড়ানো এবং পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগ এবং বাস্তব অগ্রগতি পেতে সময় লাগবে।

বৈঠকে কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও বাজারে প্রবেশাধিকারের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য ও জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন, গরুর মাংস ও পোলট্রি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে অধিক সুযোগ দাবি করে আসছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি।

এদিকে প্রযুক্তি খাত নিয়ে মতবিরোধ এখনো দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। উন্নত অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের কড়াকড়ি বহাল রয়েছে। চীন এসব পদক্ষেপকে নিজেদের শিল্পোন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে দেখছে। ফলে প্রযুক্তি ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান এখনো দূরত্বপূর্ণ।

বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যুও গুরুত্ব পেয়েছে। শি জিনপিং স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি ভুলভাবে মোকাবিলা করা হলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। ফলে এই ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং জ্বালানি বাজার নিয়েও কথা হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চীনের সহযোগিতা চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে বেইজিংয়ের এই শীর্ষ বৈঠক তাৎক্ষণিক বড় কোনো চুক্তি না আনলেও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কূটনৈতিক সৌহার্দ্য বজায় রেখে উভয় দেশ আপাতত উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে। তবে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও তাইওয়ান প্রশ্নে গভীর মতপার্থক্য এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

 

-bbc bangla

পূর্বের খবরবিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬: শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বিশ্ব, বাড়ছে কোটি ফুটবলপ্রেমীর অপেক্ষা
পরবর্তি খবরহাম ও উপসর্গে প্রাণ গেল আরও ১২ শিশুর, মৃত্যু ছাড়াল ৪৫০
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!