ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে সুরের জয়—আশা ভোসলে-র জীবনসংগ্রাম ও অমর উত্তরাধিকার

ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীতভুবনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আশা ভোসলে। তাঁর কণ্ঠে হাজারো গানের সুরে রাঙানো হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তবে সাফল্যের এই উজ্জ্বল আলোর আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর সংগ্রামময় ব্যক্তিজীবন—যেখানে প্রেম, বেদনা, হারানো আর নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর গল্প বারবার ফিরে আসে।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারকে অমান্য করে নিজের চেয়ে প্রায় ২০ বছরের বড় গণপতরাও ভোসলে-কে বিয়ে করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্তের কারণে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। বিয়ের পরের জীবনও সুখকর ছিল না। শ্বশুরবাড়ির রক্ষণশীল পরিবেশ, স্বামীর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক নির্যাতন—সব মিলিয়ে এক কঠিন সময় পার করতে হয় তাঁকে। এমনকি নিজের পরিবার, বিশেষ করে দিদি লতা মঙ্গেশকর-এর সঙ্গেও সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল।

এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই দুই সন্তানের মা হন আশা। কিন্তু জীবনের চাপ, পারিবারিক অশান্তি এবং মানসিক যন্ত্রণায় একসময় ভেঙে পড়েন তিনি। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন—যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি। পরে হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর নিজের সন্তানদের কথা ভেবে নতুন করে বাঁচার সিদ্ধান্ত নেন।

এরপর শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে নিজ পরিবারে ফিরে আসেন তিনি। শুরু করেন নতুন জীবন। তৃতীয় সন্তান জন্ম দেন এবং ধীরে ধীরে নিজের ক্যারিয়ার ও সংসারকে গুছিয়ে তোলেন। অবশেষে ১৯৬০ সালে প্রথম দাম্পত্য জীবনের ইতি টানেন।

জীবনের এই দুঃসময়ের পর তাঁর জীবনে আলো হয়ে আসেন সঙ্গীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মন। পেশাগত সম্পর্ক থেকেই গড়ে ওঠে গভীর ভালোবাসা। ‘পিয়া তু অব তো আ জা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানে এই জুটির অসাধারণ সৃষ্টিশীলতা ধরা পড়ে। ১৯৮০ সালে তাঁরা বিয়ে করেন এবং সঙ্গীতজগতে হয়ে ওঠেন এক কিংবদন্তি জুটি।

তবে সুখও স্থায়ী হয়নি। ১৯৯৪ সালে রাহুল দেব বর্মন-এর মৃত্যু তাঁর জীবনে বড় শূন্যতা তৈরি করে। এর পর একে একে হারান নিজের সন্তানদেরও—কন্যা বর্ষা এবং পুত্র হেমন্ত। ব্যক্তিজীবনের এই নির্মম আঘাতগুলো তাঁকে বারবার ভেঙে দিলেও সঙ্গীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো কমেনি।

১২ হাজারেরও বেশি গান গেয়ে সঙ্গীতজগতে অনন্য কৃতিত্ব গড়েছেন তিনি। পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মভূষণসহ বহু সম্মাননা। এমনকি আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তাঁর কণ্ঠের স্বীকৃতি মিলেছে।

৯০ বছর বয়সেও তিনি মঞ্চে টানা তিন ঘণ্টা গান গেয়েছেন—যা তাঁর অদম্য প্রাণশক্তির প্রমাণ। তাঁর নিজের কথাতেই, “মানুষ যেমন শ্বাস না নিলে বাঁচতে পারে না, আমার কাছে সঙ্গীত ঠিক তেমনই।”

সঙ্গীতের বাইরে রান্নার প্রতিও ছিল তাঁর গভীর ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাকে পেশায় রূপ দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রেস্তরাঁ ব্যবসাও গড়ে তুলেছিলেন।

জীবনের শেষ সময়ে অসুস্থ হয়ে মুম্বইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। তবে সব লড়াইয়ের ইতি টেনে শেষ পর্যন্ত বিদায় নেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। তাঁর মৃত্যুতে সঙ্গীতপ্রেমীদের মনে গভীর শোক নেমে এলেও তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গানগুলো চিরকাল বেঁচে থাকবে।

বারবার ভেঙে পড়েও যিনি আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন, যিনি বেদনার মাঝেও সুর খুঁজে পেয়েছেন—আশা ভোসলে শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি এক অনুপ্রেরণার নাম।

পূর্বের খবরবাংলাদেশের স্পিন চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে প্রস্তুত নিউজিল্যান্ড
পরবর্তি খবরহরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা—মার্কিন পদক্ষেপে বিশ্ববাজারে তেলের দামে নতুন ঊর্ধ্বগতি
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!