‘গ্লুইং’: শারীরিক ঘনিষ্ঠতাই কি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার একমাত্র ভরসা?

 

বিশেষ ফিচার

ভিনিউজ ডেস্ক: সম্পর্কের জগতে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন শব্দ যোগ হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আধুনিক প্রেমের সংস্কৃতির হাত ধরে এবার আলোচনায় এসেছে ‘গ্লুইং’। শব্দটির অর্থ আক্ষরিকভাবে ‘আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো’। সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর অর্থও অনেকটা তেমনই, যখন একটি সম্পর্কের আবেগ, বোঝাপড়া, বিশ্বাস কিংবা মানসিক ঘনিষ্ঠতা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে, তখন শারীরিক ঘনিষ্ঠতাই হয়ে ওঠে সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখার প্রধান অবলম্বন।

তবে ‘গ্লুইং’ মানেই যে খারাপ সম্পর্ক, তা নয়। বরং সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন শারীরিক সম্পর্ক ছাড়া দুজনের মধ্যে আর কোনো দৃঢ় সংযোগ থাকে না। বাইরে থেকে সম্পর্কটি স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে জমতে থাকে একাকিত্ব, ক্ষোভ, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা মানসিক দূরত্ব।

সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ারও ভূমিকা রয়েছে। শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সময় মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন, ডোপামিন ও ভ্যাসোপ্রেসিনের মতো রাসায়নিক নিঃসৃত হয়। এগুলো মানুষের মধ্যে আনন্দ, নিরাপত্তা, ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধনের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। ফলে সম্পর্কের অন্য জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে গেলেও শারীরিক ঘনিষ্ঠতা সাময়িকভাবে মনে করাতে পারে যে সবকিছু ঠিকঠাক আছে।

মুম্বাইয়ের মনোচিকিৎসক ও সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নম্রতা জৈনের মতে, কখনো কখনো এই রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া মানুষকে এমন ধারণা দিতে পারে যে সম্পর্কটি বাস্তবেই ভালো চলছে, যদিও দুজনের মধ্যে প্রকৃত সামঞ্জস্যের অভাব রয়েছে।

দিল্লির সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ রুচি রুহের মতে, অনেকেই শারীরিক ঘনিষ্ঠতার অনুভূতিকে সম্পর্কের সামগ্রিক সামঞ্জস্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। অথচ একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি শুধু শারীরিক আকর্ষণ নয়; প্রয়োজন পারস্পরিক যোগাযোগ, মূল্যবোধের মিল, মানসিক উপস্থিতি, বিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিন্ন প্রত্যাশা।

তাহলে বোঝার উপায় কী যে কোনো সম্পর্ক ‘গ্লুইং’-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে? নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে। শারীরিক ঘনিষ্ঠতার কোনো প্রত্যাশা না থাকলেও কি দুজন একসঙ্গে সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? কঠিন বা অস্বস্তিকর বিষয় নিয়ে কি খোলামেলা আলোচনা করা যায়? নিজের দুর্বলতা ও ভয়গুলো কি সঙ্গীর কাছে প্রকাশ করা নিরাপদ মনে হয়? একে অপরের জীবন, অনুভূতি ও চিন্তার প্রতি কি সত্যিই আগ্রহ রয়েছে?

ঝগড়ার পর বারবার শারীরিক ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা, কিন্তু ঝগড়ার প্রকৃত কারণ নিয়ে আলোচনা না করা এটিও ‘গ্লুইং’-এর একটি লক্ষণ হতে পারে। একইভাবে, সম্পর্কের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ বা অমিল থাকা সত্ত্বেও শুধু ‘শারীরিক রসায়ন’ ভালো হওয়ার কারণে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে না পারাও সতর্ক হওয়ার বিষয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের একটি সুস্থ সম্পর্কে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পারস্পরিক ভালোবাসা ও বন্ধনকে আরও গভীর করতে পারে এবং কঠিন সময় পার করতেও সাহায্য করে। সমস্যা তখনই, যখন এটি সম্পর্কের সমস্যাগুলো সমাধানের বদলে সেগুলো ঢেকে রাখার উপায় হয়ে ওঠে।

তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু কাছাকাছি থাকা নয়, একে অপরকে বোঝাও জরুরি। শারীরিক ঘনিষ্ঠতার বাইরে যদি থাকে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস, কথা বলার সুযোগ, মানসিক নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সম্মান তবেই একটি সম্পর্ক সত্যিকার অর্থে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। আর শারীরিক ঘনিষ্ঠতা সরিয়ে নিলে যদি মনে হয়, ‘আমাদের মধ্যে আসলে আর কী আছে?’ তাহলে হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এসেছে।

-ইন্ডিয়া টুডে

পূর্বের খবরকৃতি শ্যানন : পোশাক বিতর্ক নিয়ে এবার ক্ষোভ প্রকাশ করলেন
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!