এলোমেলো ভাবনাতেই কমতে পারে দুশ্চিন্তা, দ্রুত ঘুম আনতে আলোচনায় ‘কগনিটিভ শাফলিং’
তানজিনা হাসান মৌ
বিশেষ ফিচার
ভিনিউজ : অনিদ্রা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ এখন বিশ্বের কোটি মানুষের নিত্যসঙ্গী। ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা কিংবা ব্যক্তিগত নানা সংকটের কারণে রাতে বিছানায় শুয়েও অনেকের ঘুম আসে না। এই সমস্যার সমাধানে ধ্যান, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম কিংবা ওষুধের কথা শোনা গেলেও সম্প্রতি মনোবিজ্ঞানীদের আলোচনায় উঠে এসেছে এক ভিন্নধর্মী মানসিক কৌশল- ‘কগনিটিভ শাফলিং’ (Cognitive Shuffling)। গবেষকদের দাবি, মাত্র কয়েক মিনিটের এই সহজ মানসিক অনুশীলন উদ্বেগ কমিয়ে স্বাভাবিক ঘুম আনতে সহায়ক হতে পারে।
এই পদ্ধতিকে অনেক গবেষক ‘মাইক্রো ড্রিমিং’ বা ক্ষুদ্র স্বপ্ন দেখার অনুশীলনও বলছেন। এতে ধ্যানের মতো মনকে এক জায়গায় স্থির রাখতে হয় না, আবার জটিল কোনো ব্যায়ামও করতে হয় না। বরং চোখ বন্ধ করে সম্পূর্ণ এলোমেলো, পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিষয় কল্পনা করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
কানাডার সাইমন ফ্রেজার ইউনিভার্সিটির গবেষক লুক বোদোয়াঁ দীর্ঘদিন ধরে এই পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, মানুষ যখন বিছানায় শুয়ে একই সমস্যা বা দুশ্চিন্তা নিয়ে বারবার ভাবতে থাকে, তখন মস্তিষ্ক আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ঘুম দূরে সরে যায়। কিন্তু সম্পর্কহীন নানা ছবি, বস্তু বা ঘটনার কথা কল্পনা করলে মস্তিষ্ক সেই উদ্বেগের চক্র থেকে বেরিয়ে আসে এবং ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয়।
কীভাবে করবেন এই অনুশীলন?
কগনিটিভ শাফলিংয়ের নিয়ম খুবই সহজ। প্রথমে একটি সাধারণ শব্দ বেছে নিতে হবে। যেমন- “Cake”। এরপর শব্দটির প্রতিটি অক্ষর ধরে সেই অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া যত সম্ভব শব্দ, ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর কথা কল্পনা করতে হবে।
ধরা যাক, C দিয়ে Cat, Cloud, Car, Candle- এভাবে একের পর এক ভাবতে হবে। শুধু নাম নয়, সেই বস্তু বা প্রাণীর রং, আকার কিংবা বৈশিষ্ট্যও কল্পনায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। এরপর A, K এবং E অক্ষর নিয়েও একইভাবে ভাবতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব ভাবনার মধ্যে কোনো মিল বা ধারাবাহিকতা থাকবে না। একটি চিন্তার সঙ্গে আরেকটি চিন্তার সম্পর্ক না থাকাই এই পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য।
কেন কার্যকর হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের আগে মানুষ যখন ভবিষ্যৎ, কাজ, অর্থনৈতিক চাপ বা ব্যক্তিগত সমস্যার মতো আবেগঘন বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকে, তখন মস্তিষ্ক ‘হাইপারঅ্যারাউজাল’ বা অতিসক্রিয় অবস্থায় চলে যায়। এ সময় উদ্বেগ বাড়ে, কর্টিসলসহ স্ট্রেস হরমোনের প্রভাবও বৃদ্ধি পায়। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং অনিদ্রার সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
কগনিটিভ শাফলিং এই মানসিক চক্রে ভিন্ন ধরনের উদ্দীপনা তৈরি করে। এলোমেলো ও আবেগহীন কল্পনা মস্তিষ্ককে জটিল বিশ্লেষণ বা নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে রাখে। এতে ধীরে ধীরে মানসিক উত্তেজনা কমে আসে এবং স্বাভাবিক ঘুমের পরিবেশ তৈরি হয়।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই পদ্ধতিকে ‘সিরিয়াল ডাইভার্স ইমাজিনিং (Serial Diverse Imagining-SDI)’ নামেও পরিচিত। এর সঙ্গে মনঃসমীক্ষণের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন’ ধারণার কিছু মিল থাকলেও কগনিটিভ শাফলিংয়ে একটি নির্দিষ্ট শব্দকে কেন্দ্র করে এলোমেলো কল্পনার ধারা তৈরি করা হয়।
গবেষণা কী বলছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদ্ধতি ঘুমের আগে মানুষের স্বাভাবিক মানসিক অবস্থার সঙ্গে কিছুটা মিল তৈরি করে। ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগে মস্তিষ্কে যেভাবে বিচ্ছিন্ন ও অসংলগ্ন চিন্তার প্রবাহ তৈরি হয়, কগনিটিভ শাফলিং সেই প্রক্রিয়াকে কৃত্রিমভাবে অনুকরণ করে। ফলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে ঘুমের পর্যায়ে প্রবেশ করতে সুবিধা পায়।
যদিও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন, তবুও প্রাথমিক গবেষণা ও ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেকের ক্ষেত্রে এটি উদ্বেগ কমাতে এবং দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সহায়ক হয়েছে।
ওষুধ নয়, সহজ মানসিক কৌশল
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কগনিটিভ শাফলিং কোনো চিকিৎসার বিকল্প নয়। দীর্ঘদিনের অনিদ্রা, তীব্র উদ্বেগ বা মানসিক রোগের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। তবে সাময়িক দুশ্চিন্তা বা ঘুমের সমস্যা থাকলে এটি একটি সহজ, নিরাপদ এবং বিনা খরচের মানসিক অনুশীলন হিসেবে চেষ্টা করা যেতে পারে।
চোখ বন্ধ করে কয়েক মিনিটের জন্য সম্পর্কহীন কিছু ছবি, মানুষ, প্রাণী কিংবা বস্তুর কথা কল্পনা করা- এতটুকুই। হয়তো এই এলোমেলো ভাবনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে শান্ত ঘুম আর কিছুটা স্বস্তির পথ।




