আদিত্য রুদ্র
বিশেষ প্রতিবেদন
ভিনিউজ : বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি। স্পেনের বিপক্ষে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা, আর এই ম্যাচকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-এটাই কি নীল-সাদা জার্সিতে মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ?
শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নামছে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা। যদি তারা স্পেনকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে, তবে ইতালি (১৯৩৪ ও ১৯৩৮) এবং ব্রাজিলের (১৯৫৮ ও ১৯৬২) পর টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ী তৃতীয় দল হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখাবে আলবিসেলেস্তেরা।
এই ঐতিহাসিক অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু চার বছর পর আবারও তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছেন অসাধারণ পারফরম্যান্সে।
চলতি বিশ্বকাপে সাত ম্যাচে আট গোল করে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মেসি। গোলের পাশাপাশি নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা এবং বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা আবারও প্রমাণ করেছে কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলা হয়।
ফাইনালে জিততে পারলে মেসি হবেন ইতিহাসের প্রথম অধিনায়ক, যিনি দুইবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন। এটি শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জনই নয়, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসেও এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে।
তবে ম্যাচের আগে আলোচনার সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে তার ভবিষ্যৎ। ২০১৬ সালে একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েও পরে ফিরে এসেছিলেন মেসি। তাই এবারও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না কেউ।
স্প্যানিশ ফুটবল বিশ্লেষক গিয়েম বালাগের বিশ্বাস, মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তার মতে, আর্জেন্টিনার হয়ে খেলাটা এখনও উপভোগ করেন মেসি এবং সেই আবেগই তাকে আরও কয়েক বছর জাতীয় দলের সঙ্গে বেঁধে রাখতে পারে।
বিশেষ করে ২০৩০ বিশ্বকাপের একটি বড় আকর্ষণ রয়েছে। শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়েতে উদ্বোধনী ম্যাচগুলোর আয়োজন হবে। নিজের দেশের দর্শকদের সামনে আরেকটি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার সুযোগ মেসির জন্য বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যদি তিনি ২০৩০ বিশ্বকাপেও খেলেন, তাহলে ৪৩ বছর বয়সে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড ফুটবলার হওয়ার রেকর্ড গড়বেন। যদিও সেটি নির্ভর করবে তার শারীরিক সক্ষমতা, ফিটনেস এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর।

মেসির সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স অবশ্য আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ দিচ্ছে। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বেও তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে গোল না করলেও দুটি অ্যাসিস্ট করে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এতে বিশ্বকাপে তার মোট অ্যাসিস্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২, যার মধ্যে ১০টিই নকআউট পর্বে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে অন্য কোনো ফুটবলারের অ্যাসিস্ট আটটির বেশি নয়। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রেও তিনি এককভাবে শীর্ষে অবস্থান করছেন।
বিশ্বকাপে মেসির রেকর্ডের তালিকাও দীর্ঘ। তিনি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মাত্র দুই ফুটবলারের একজন তিনি। এছাড়া দুইবার গোল্ডেন বল জয়ী একমাত্র খেলোয়াড়ও মেসি।
২০২২ সালে শিরোপা জয়ের পথে গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েছেন তিনি। টানা ১১টি বিশ্বকাপ উপস্থিতিতে গোল কিংবা অ্যাসিস্ট করার রেকর্ডও তার দখলে। পাশাপাশি বিশ্বকাপের তিনটি ফাইনাল খেলতে নামা ইতিহাসের দ্বিতীয় ফুটবলার হতে যাচ্ছেন তিনি; এর আগে এই কীর্তি ছিল শুধু ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর।
আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিও মেসির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তার ভাষায়, “মেসি ইতিহাসের অংশ, তিনি এক কিংবদন্তি। ৩৯ বছর বয়সে আবারও বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠা অবিশ্বাস্য। তিনি এখনও আমাদের সঙ্গে আছেন, তাই তাকে উপভোগ করা উচিত।”
তবে মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি স্কালোনি। তিনি বলেন, “এটাই তার শেষ ম্যাচ কি না, সেটা কেবল মেসিই বলতে পারবেন। আমরা এ নিয়ে আলোচনা করিনি।”
ফলে আজকের বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু একটি শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ নয়; এটি হতে পারে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্তও। যদি এটাই হয় মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ, তাহলে বিশ্ব দেখবে এক কিংবদন্তির বিদায়। আর যদি তিনি আরও একবার ফিরে আসেন, তাহলে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে ফুটবলপ্রেমীরা হয়তো আবারও সাক্ষী হবেন ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তির।




