ভিনিউজ ডেস্ক : ইউক্রেনের সঙ্গে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর উদ্যোগের মধ্যেই দেশটির ওপর হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে রাশিয়া। স্থলযুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হয়ে মস্কো এখন ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো, শিল্পকারখানা, কৃষি, বন্দর ও বাণিজ্যিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ব্যাপক আকাশ হামলা চালাচ্ছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাশিয়ার এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতি নয়, বরং ইউক্রেনের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া। এর ফলে আসন্ন শীত দেশটির মানুষের জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
মার্কিন মধ্যস্থতায় আগামী সপ্তাহে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হলেও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হামলা আরও জোরদার করেছেন। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বিভাগের প্রধান জন লফের মতে, রাশিয়ার বর্তমান বিমান অভিযান স্পষ্টতই ইউক্রেনের অর্থনীতি ধ্বংস করার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর বিশ্লেষণ, পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলে স্থলযুদ্ধে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় রাশিয়া এখন অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে দেশটিকে দুর্বল করার কৌশল নিয়েছে।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রুশ হামলায় এ পর্যন্ত ইউক্রেনের ২ হাজার ৭০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক মাসের পর বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬৫০। অক্টোবরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৩২-এ।
রাশিয়ার হামলার লক্ষ্যবস্তু এখন ইউক্রেনের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো। কৃষি ও শস্য রপ্তানির কেন্দ্র, কৃষ্ণসাগর ও দানিয়ুব নদীর বন্দর, রেল যোগাযোগ, গুদাম, শিল্পকারখানা এবং ইস্পাতশিল্পে ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে। আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে ক্রিভি রিহ ও জাপোরিঝঝিয়ার প্রধান ইস্পাত কারখানাগুলো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এতে হাজারো শ্রমিকের আয় ও সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি অবকাঠামোর পরিস্থিতিও ভয়াবহ। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রোববার রাতে দনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের বিদ্যুৎব্যবস্থায় রুশ হামলায় ছয় লাখের বেশি মানুষ বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েন। খারকিভ ও ঝিতোমিরসহ অন্যান্য অঞ্চলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ সালের শীতকালে বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় পরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে রাশিয়া যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। এদিকে আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটির (আইআরসি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বহু মানুষ বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। মাইকোলাইভ অঞ্চলে জরিপে অংশ নেওয়া ৯১ শতাংশ পরিবার জরুরি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে। দনিপ্রোপেত্রোভস্কে এই হার ৪২ শতাংশ। এমনকি জীবিকা ধরে রাখতে অনেক কৃষক মাইনবিছানো জমিতেও কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহার সতর্কবার্তা, শীতের আগে লাখ লাখ মানুষকে বিদ্যুৎ, তাপ ও পানিবিহীন করার চেষ্টা করছে মস্কো। সব মিলিয়ে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও যুদ্ধের ময়দানের পাশাপাশি ইউক্রেনের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।




