আদিত্য রুদ্র
ভিনিউজ : অন্ধকারের বুকে আলোর জয়, অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয় এবং অজ্ঞতার বিরুদ্ধে জ্ঞানের আহ্বান—এই চিরন্তন বার্তা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্যাপিত হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দীপাবলি বা দেওয়ালি। বাংলাদেশে যা দীপাবলি ও শ্যামাপূজা হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তা দেওয়ালি বা দীপাবলি নামে পালিত হয়। মাটির প্রদীপ, মোমবাতি, আলোকসজ্জা, পূজা-অর্চনা, মিষ্টি বিতরণ, পারিবারিক মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে উঠেছে উৎসবের পরিবেশ।
ভারত ও বাংলাদেশে মূল দীপাবলি উদ্যাপিত হচ্ছে আজ রোববার। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিকে কেন্দ্র করে এই উৎসব পালিত হয়। তবে তিথি ও স্থানীয় পঞ্জিকার পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা কয়েক দিন ধরে চলে। বাংলাদেশেও আজ ৮ নভেম্বর শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উদ্যাপিত হচ্ছে।
দীপাবলি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘দীপাবলি’ থেকে। এর অর্থ প্রদীপের সারি বা আলোর সমাহার। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি। উত্তর ভারতের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রামায়ণের কাহিনিতে চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে রাবণকে পরাজিত করে অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন রাজা রাম, স্ত্রী সীতা ও ভাই লক্ষ্মণ। তাঁদের প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাতে অযোধ্যার মানুষ ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন। সেই ঐতিহ্য থেকেই দীপাবলিতে প্রদীপ প্রজ্বালনের প্রচলন।

আবার দক্ষিণ ভারতের অনেক অঞ্চলে এই উৎসব পালিত হয় অসুররাজ নরকাসুরের বিরুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণের বিজয়ের স্মরণে। অন্যদিকে, জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দীপাবলি মহাবীরের নির্বাণ লাভের স্মারক। শিখ সম্প্রদায়ের কাছে দিনটি গুরু হরগোবিন্দের কারামুক্তির স্মৃতিবাহী, যা ‘বন্দি ছোড় দিবস’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ ধর্মীয় ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে উৎসবটির মূল বার্তা অশুভ শক্তির পরাজয় এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা।
দীপাবলির অন্যতম আকর্ষণ মাটির প্রদীপ বা দিয়া। অন্ধকার দূর করে আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এই প্রতীকী আয়োজনের রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। প্রদীপের আলো মানুষের অন্তরের অজ্ঞতা, হিংসা, অহংকার ও নেতিবাচক চিন্তা দূর করে জ্ঞান, মানবিকতা, সত্য ও শুভবোধের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়। হিন্দু বিশ্বাসে এই রাতে ধনসম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, পরিচ্ছন্ন ও আলোকিত ঘরে দেবী লক্ষ্মীর আগমন ঘটে। তাই ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, দরজায় আলপনা বা রঙিন নকশা আঁকা এবং প্রদীপ জ্বালানো উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
বাংলাদেশে কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপাবলি মূলত শ্যামাপূজাকে কেন্দ্র করে উদ্যাপিত হয়। দেবী কালীর আরাধনা, পূজা-অর্চনা, মন্দিরে আলোকসজ্জা এবং বাড়িতে বাড়িতে প্রদীপ প্রজ্বালন এই উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালীমন্দির, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার এবং পোস্তগোলা মহাশ্মশালাসহ বিভিন্ন স্থানে বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন মন্দিরে পূজার আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজার এলাকায় চলছে আলোকসজ্জা ও পূজার আনুষ্ঠানিকতা। বাড়ি, মন্দির ও শ্মশানে প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালানোর পাশাপাশি প্রয়াত স্বজনদের স্মরণেও আলো প্রজ্বালন করেন অনেকে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষ।
ভারতে পাঁচ দিনব্যাপী দীপাবলি উৎসবের আয়োজন দেখা যায়। ধনতেরাসের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা, এরপর নরক চতুর্দশী, মূল দীপাবলি, গোবর্ধন পূজা এবং ভাইফোঁটা বা ভাইদুজের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। ঘরে ঘরে লক্ষ্মী ও গণেশের পূজা, রঙিন আলপনা, আতশবাজি, মিষ্টি বিতরণ এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় উৎসবের পরিচিত চিত্র। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী উদ্যাপনের ধরনেও রয়েছে ভিন্নতা।
নেপালে দীপাবলি ‘তিহার’ নামে পরিচিত। এটি দেশটির অন্যতম বড় উৎসব এবং পাঁচ দিন ধরে পালিত হয়। লক্ষ্মীপূজার রাতে ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলে। শেষ দিনে ভাই-বোনের সম্পর্কের বন্ধন উদ্যাপিত হয় ‘ভাই টিকা’র মাধ্যমে। ২০২৬ সালে নেপালে তিহার ৭ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত পালিত হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে দীপাবলি এখন ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী ভারতীয় ও হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক উৎসব। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে প্রতিবছর দীপাবলি উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নৃত্য, সংগীত ও আলোকসজ্জার আয়োজন করা হয়। এ বছরও ২৪ অক্টোবর টাইমস স্কয়ারে দীপাবলির বিশেষ অনুষ্ঠান হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে মন্দির ও প্রবাসী সংগঠনগুলো পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পারিবারিক উৎসবের আয়োজন করছে। ডিজনি ওয়ার্ল্ডেও দীপাবলি উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে লন্ডনের ওয়েম্বলি এলাকায় মন্দির ও প্রবাসী সংগঠনগুলো উৎসবের আয়োজন করেছে। মন্দিরকেন্দ্রিক পূজা, আলোকসজ্জা, সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকছে আয়োজনের অংশ হিসেবে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মরিশাস, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কাতেও দীপাবলি উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হচ্ছে। দেশভেদে কোথাও সরকারি ছুটি, কোথাও আবার স্থানীয় মন্দির ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে উৎসব পালিত হচ্ছে।
দীপাবলি এখন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বিনিময়ের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। প্রদীপের আলো যেমন অন্ধকার দূর করে, তেমনি মানুষের মধ্যে বিভেদ, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা দূর করার প্রতীক হিসেবেও এই উৎসবের তাৎপর্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে দীপাবলি মানুষের মনে নতুন আশার আলো জ্বালানোর উৎসব। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মানুষের কাছে এই উৎসবের বার্তা একটাই, অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলোর সম্ভাবনা কখনো নিঃশেষ হয় না।




