৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ না খুললে ইরানে নরক নেমে আসবে: ট্রাম্প

নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেয়া এক পোস্টে গতকাল ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমি ইরানকে একটি চুক্তিতে পৌঁছতে অথবা হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার জন্য ১০ দিনের সময় দিয়েছিলাম। সময় শেষ হয়ে আসছে। এখন হাতে আছে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। এর পরই তাদের ওপর চরম ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসবে।’

এদিকে মার্কিন এফ-১৫ বিমান ভূপাতিত করার পর আরো একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি জানিয়েছে তেহরান। এ-১০ ওয়ার্থগ মডেলের যুদ্ধবিমানটি হরমুজ প্রণালির কাছে পারস্য সাগরে আছড়ে পড়ে। এ বিমানের একমাত্র পাইলটকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে একই দিন দেশটির মধ্যাঞ্চলে মার্কিনদের একটি এফ-১৫ ভূপাতিত করা হয়।

এ নিয়ে যুদ্ধের পর সাতটি যুদ্ধবিমান হারাল যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে গত ২ মার্চ কুয়েতের আকাশে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুলে তিনটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপতিত হয়। ১২ মার্চ ইরাকের আকাশসীমায় একটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে মার্কিন বিমান বাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হন। ২৭ মার্চ সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলায় রানওয়েতে মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি ই-৩ সেন্ট্রি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়। এছাড়া গত মাসে মধ্যপ্রাচ্যের এক মার্কিন বিমানঘাঁটিতে একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান জরুরি অবতরণ করে। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হামলায় যুদ্ধবিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য ও আকাশপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের যে বয়ান ট্রাম্প প্রশাসন এক মাস ধরে প্রচার করে আসছিল, যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় সে দাবি নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার দাবি করেছিলেন যে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা রাডার ব্যবস্থা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই এবং মার্কিন বিমানগুলো তেহরানের আকাশে সম্পূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন অবস্থায় বিচরণ করছে। কিন্তু রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। প্রশাসনের এমন অতিরঞ্জিত সামরিক সাফল্যের দাবি এখন বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিকভাবে এটি প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ তারা মার্কিন জনগণের কাছে এ যুদ্ধকে একটি ‘সহজ জয়’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইরানের এ প্রত্যাঘাত প্রমাণ করে যে আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যতটা সহজ বলা হয়েছিল, বাস্তবে তা ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনিশ্চিত।

পাশাপাশি কীভাবে ইরান মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যে ফুটেজ প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে মার্কিন যুদ্ধবিমান সারফেস-টু-এয়ার মিসাইলের আঘাতে বিধ্বস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এ ট্র্যাকিং প্রচলিত রাডার পদ্ধতিতে হয়নি। ব্যবহার হয়েছে অত্যাধুনিক ইলেকট্রোঅপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড সেন্সর। ইরানি রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার ছবিগুলোয় উচ্চ কন্ট্রাস্ট থার্মাল ইমেজ স্পষ্ট, যা ইলেকট্রোঅপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড সেন্সর ট্র্যাকিং সিস্টেমের বৈশিষ্ট্য।

তবে ইরান জানিয়েছে, নতুন উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে শুক্রবার দেয়া দেশটির খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফাগারি বলেন, ইরানের নিজস্ব ‘নতুন উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ ব্যবহার করে বিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল ইসরায়েলের তেল আবিবে কিরিয়া সামরিক ঘাঁটির কাছে একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দুটি ‘ক্লাস্টার ওয়ারহেড’ আঘাত হেনেছে। এ ঘাঁটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হামলায় ওই ঘাঁটির পাশের একটি পার্কিং লট এবং নিকটবর্তী একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া রামাত গানে ক্ষেপণাস্ত্রের ক্লাস্টার ওয়ারহেডের আঘাতে বেশ কয়েকটি গাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। বিস্ফোরণে কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্টও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর জানিয়েছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী মাহশাহর বিশেষ পেট্রোকেমিক্যাল অঞ্চলে হামলা চালিয়েছে। ভ্যালিওল্লাহ হায়াতির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকালে প্রাদেশিক রাজধানী আহভাজের পূর্ব ও পশ্চিমে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া বেলা ১১টার দিকে খোররামশাহরের শলামচেহ সীমান্ত বাণিজ্য টার্মিনালে হামলা চালানো হয় এবং এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো এরপর আবু আলী পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে আঘাত হানে। পরে তারা বন্দর-ই ইমাম খোমেনি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আংশিক ক্ষতি করে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে ‘জরুরি পণ্য’ বহনকারী জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেবে বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তেহরান ‘জরুরি পণ্য’ বহনকারী জাহাজ চলাচলের জন্য এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ উন্মুক্ত রাখবে। হরমুজ প্রণালি তেহরান কার্যত বন্ধ রাখায় বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বনেতারা এ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ এখনো এ পথ দিয়ে যাতায়াত করতে পারছে। ইরান আগেই জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং তাদের মিত্রদের ছাড়া অন্যদের জাহাজ এ জলপথ দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে।

এদিকে ইরানের সেনাবাহিনী ও আইআরজিসির আকাশ প্রতিরক্ষা অবস্থানগুলো পরিদর্শনের সময় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী রেজা এলহামি জানিয়েছেন, ইরানি ইউনিটগুলো সফলভাবে শত্রুপক্ষের বেশ কয়েকটি উন্নত যুদ্ধবিমান, ১৬০টিরও বেশি ড্রোন ও কয়েক ডজন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। ভূপাতিত করা ড্রোনের মধ্যে এমকিউ-৯, হার্মিস ও লুকাস মডেলের ড্রোনও রয়েছে। এলহামি উল্লেখ করেন, এ ব্যবস্থা আক্রমণকারীদের ‘কাল্পনিক প্রোপাগান্ডা’ ভেঙে দিয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানি বাহিনী শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের জন্য ওত পেতে আছে।

অন্যদিকে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ৪৮ ঘণ্টার একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। নাম প্রকাশ না করে সূত্রটি জানায়, গত বুধবার একটি বন্ধু দেশের মাধ্যমে এ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। দেশটির নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে সেই প্রস্তাব বা এর সত্যতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য বা নিশ্চিত করার তথ্য পাওয়া যায়নি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করে। জবাবে ইরানও ইসরায়েলসহ জর্ডান, ইরাক ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এমন উপসাগরীয় দেশগুলোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।

পূর্বের খবরবিসিবিতে পদত্যাগের হিড়িক, একই দিনে সরে দাঁড়ালেন আরও চার পরিচালক
পরবর্তি খবরজ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে : অর্থমন্ত্রী
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!