ভিনিউজ : দীর্ঘ ২৬ দিনের অনশন শেষে ভারতের শিক্ষাবিদ, পরিবেশকর্মী ও র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনম ওয়াংচুক অনশন ভেঙেছেন। শুক্রবার দিবাগত রাতে হাসপাতালে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে তিনি অনশন ভঙ্গ করেন। হাসপাতালের শয্যায় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো এবং লেহ-লাদাখের ‘এপেক্স বডি’র নেতারাও। তবে ওয়াংচুকের অনশন শেষ হলেও সর্বভারতীয় ডাক্তারি ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সোনম ওয়াংচুক জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ৬৫ জন সংসদ সদস্য তাকে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়েছিলেন। দীর্ঘ আলোচনা, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত এবং দেশজুড়ে সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কা বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আন্দোলনের সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনোভাবেই যেন সহিংসতা না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, শিগগিরই একটি ভিডিও বার্তায় অনশন ভাঙার পেছনের শর্ত ও সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরবেন।
ওয়াংচুকের অনশন ভাঙার পর ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এক ভিডিও বার্তায় তার সাহস ও আত্মত্যাগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওয়াংচুক গোটা দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান অবস্থান কর্মসূচি ও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
গত ২৮ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করেছিলেন সোনম ওয়াংচুক। এর আগেই সিজেপি ‘নিট’ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল। ১৮ জুলাই সকালে দিল্লি পুলিশ তাকে অনশনস্থল থেকে সরিয়ে সরকারি সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তাকে গুরুগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকে তার স্ত্রী এবং সিজেপির নেতারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

এদিকে সিজেপির ডাকা সংসদ অভিযানে দিল্লিতে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হওয়া আন্দোলনকারীদের থামাতে পুলিশ ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। আন্দোলনকারীদের একাংশ ব্যারিকেড অতিক্রম করে জাতীয় প্রেস ক্লাব ও রেল ভবনের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বহু আন্দোলনকারী ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। বুধবারও দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ অভিযোগ করে, আন্দোলনকারীদের একটি অংশ তাদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তোলেন।
দিল্লির গণ্ডি ছাড়িয়ে এই আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। মুম্বাই, কলকাতা, পাটনা, আহমেদাবাদ, তামিলনাড়ুসহ একাধিক স্থানে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরাও দিল্লির আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। পাশাপাশি অভিনেত্রী শাবানা আজমি, অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ এবং সংগীতশিল্পী অরিজিৎ সিংসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় বলেছেন, দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না। তিনি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এবং শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। ফলে সোনম ওয়াংচুকের অনশন শেষ হলেও ‘নিট’ প্রশ্নপত্র ফাঁসকে ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন এখনো ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।




