ভিনিউজ আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (HRANA)। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানের মধ্যে তেহরান একদিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির কথা বলছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, “সমান অবস্থানে, পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ আলোচনায়” ইরান প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশটি যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে দেওয়া এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন—ইরান আলোচনার জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরুর পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গভীর অনাস্থা। ইরান স্পষ্টভাবে বলছে, নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তাদের সার্বভৌম অধিকার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র একে ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখছে, কারণ ওয়াশিংটনের আশঙ্কা—এই কর্মসূচি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে অগ্রসর হতে পারে। যদিও তেহরান বারবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সময়ই ইসরায়েলের হামলার মুখে পড়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর তাদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আলোচনায় অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত ধীর। নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পরই ইসরায়েলি হামলা ঘটে বলে মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প।
বিক্ষোভ দমনে সরকার তিন দিনের বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বন্ধ রেখেছে। ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। HRANA জানিয়েছে, এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
তেহরানের এক বাসিন্দা সিএনএনকে বলেন, “সহিংসতা কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ।” তিনি জানান, প্রতিদিন বিকেলের মধ্যেই বহু কর্মস্থল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে এবং শহরে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ইরানে সহিংস দমন-পীড়নের ঘটনায় ইউরোপের একাধিক দেশ তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, পর্তুগাল ও যুক্তরাজ্য সরকার একযোগে ইরানি কর্তৃপক্ষকে সহিংসতা বন্ধ, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং ইন্টারনেট সংযোগ পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপ কাউন্সিল সতর্ক করে বলেছে, এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে ইরানের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেও সংহতি বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। লস অ্যাঞ্জেলেসে এক বিক্ষোভে গাড়ি তুলে দেওয়ার ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। লন্ডনে ইরানি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভের জেরে তেহরান ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে।
সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল-ইরান সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই বিক্ষোভকে সরকার ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিত্রিত করছে। একই সঙ্গে কুর্দি, বালুচসহ বিভিন্ন জাতিগত ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমর্থন বিক্ষোভকে আরও বিস্তৃত করেছে। ফলে সাম্প্রতিক দশকে ইরানের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলনে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ ও আলোচনার দ্বৈত বার্তার মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোন পথে এগোবে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনও অনিশ্চিত।


