তানিয়া আক্তার
বিশেষ স্বাস্থ্য প্রতিবেদন
ভিনিউজ : সন্তান জন্মের পর শরীরের বাড়তি ওজন কমানো এবং আগের শারীরিক গঠন ফিরে পাওয়ার ইচ্ছা অনেক মায়েরই থাকে। কেউ শুরু করেন হাঁটাহাঁটি, কেউ যোগব্যায়াম, আবার কেউ দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় জিমে গিয়ে ভারী ব্যায়াম শুরু করেন। কিন্তু এখানেই রয়েছে বড় বিপদ। প্রসবের পর শরীর পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই কঠোর ব্যায়াম শুরু করলে উপকারের বদলে দেখা দিতে পারে নানা শারীরিক জটিলতা।
গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীরে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। জরায়ুর আকার বৃদ্ধি, পেটের পেশিতে টান, পেলভিক ফ্লোর বা শ্রোণিদেশের পেশির ওপর চাপ এবং হরমোনের ওঠানামা, সব মিলিয়ে শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় দিতে হয়। তার ওপর নবজাতকের যত্ন, রাত জাগা, স্তন্যপান এবং ঘুমের ঘাটতি নতুন মায়ের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই সন্তান জন্মের পরপরই আগের মতো ব্যায়ামের রুটিনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা ঠিক নয়।

সবচেয়ে বড় ভুল হলো, শরীরের প্রস্তুতি না বুঝে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা করা। বিশেষ করে ভারী ওজন তোলা, দৌড়ানো, পেটের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এমন সিট-আপ বা ক্রাঞ্চ করার ফলে ব্যথা, পেলভিক ফ্লোরের সমস্যা কিংবা প্রস্রাব ধরে রাখতে অসুবিধা বেড়ে যেতে পারে।
ছয় থেকে আট সপ্তাহ কি বাধ্যতামূলক অপেক্ষার সময়?
এ বিষয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। সব মায়ের জন্য ছয় থেকে আট সপ্তাহ অপেক্ষা করার নিয়ম নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (ACOG) বলছে, স্বাভাবিক প্রসব এবং জটিলতাহীন গর্ভাবস্থার ক্ষেত্রে মা শারীরিকভাবে প্রস্তুত বোধ করলে কয়েক দিনের মধ্যেই হালকা ব্যায়াম শুরু করতে পারেন। যেমন ধীরে হাঁটা বা হালকা শরীরচর্চা। তবে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার, অতিরিক্ত রক্তপাত কিংবা অন্য কোনও জটিলতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করতে হবে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএসও বলছে, প্রসবের পর হালকা হাঁটাচলা ও শরীর প্রসারণের ব্যায়াম দিয়ে শুরু করা যায়। তবে দৌড়ানো বা দ্রুত শরীরের ওপর চাপ পড়ে এমন ব্যায়ামে ফেরার আগে ছয় সপ্তাহের প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চার ধাপে ফিরুন ব্যায়ামের অভ্যাসে
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রসবের পর ব্যায়ামে ফেরার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
প্রথম ধাপ, শরীরকে বুঝতে শেখা। নিজের শরীরের ক্লান্তি, ব্যথা, ঘুমের ঘাটতি এবং মানসিক অবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, পানি পান এবং হালকা হাঁটাচলা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ, শরীরের মূল পেশিগুলোকে সক্রিয় করা। পেট, পিঠ, নিতম্ব এবং পেলভিক ফ্লোরের পেশিগুলো গর্ভাবস্থায় যথেষ্ট চাপের মধ্যে থাকে। তাই প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শে উপযুক্ত ব্যায়াম বেছে নেওয়া ভালো। শুধু পেটের মেদ কমানোর ব্যায়াম করলেই হবে না।

তৃতীয় ধাপ, ধীরে ধীরে পেশির শক্তি ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। হালকা হাঁটা, সহজ যোগব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ডের ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে ব্যায়ামের সময় কোনও অস্বস্তি হলে জোর করা যাবে না।
চতুর্থ ধাপ, আগের ব্যায়ামের রুটিনে ফেরা। শরীর যথেষ্ট সুস্থ হলে ধীরে ধীরে কার্ডিয়ো, দৌড় বা ভারী ব্যায়াম শুরু করা যায়। তবে প্রত্যেকের শারীরিক অবস্থা ও সুস্থ হওয়ার সময় এক নয়। তাই একই নিয়ম সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
যে লক্ষণগুলো দেখলে ব্যায়াম বন্ধ করবেন
ব্যায়াম করার সময় বা পরে তলপেটে কিংবা কোমরে ব্যথা বেড়ে যাওয়া, যোনিপথে রক্তপাত বৃদ্ধি, প্রস্রাব ধরে রাখতে সমস্যা, পেলভিক অঞ্চলে ভারী চাপ অনুভব কিংবা পেটের মাঝখানে অস্বাভাবিক ফোলা দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে। এসব ক্ষেত্রে ব্যায়াম বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা পায়ের একদিকে ব্যথা ও ফোলা দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
ওজন কমাতে গিয়ে খাবার কমিয়ে দেবেন না
নতুন মায়েদের আরেকটি ভুল হলো দ্রুত ওজন কমানোর জন্য খাবার কমিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে যারা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, তাদের পর্যাপ্ত পুষ্টি ও পানির প্রয়োজন রয়েছে। সুষম খাবার, শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ, ডিম ও পর্যাপ্ত প্রোটিন খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি। স্তন্যপান করানোর আগে বা ব্যায়ামের আগে শিশুকে দুধ খাইয়ে নিলে মায়ের শারীরিক অস্বস্তিও কমতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রসবের পর যাঁদের শারীরিক কোনও বাধা নেই, তাঁরা ধীরে ধীরে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন। তবে একেবারে শুরুতেই এই লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করা উচিত নয়। অল্প সময়ের ব্যায়াম দিয়ে শুরু করে শরীরের সামর্থ্য অনুযায়ী সময় ও পরিশ্রম বাড়াতে হবে।
সন্তান জন্মের পর শরীরের পরিবর্তন স্বাভাবিক। তাই আগের চেহারায় ফেরার জন্য তাড়াহুড়ো না করে শরীরকে সুস্থ হওয়ার সময় দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, ব্যায়ামের উদ্দেশ্য শুধু ওজন কমানো নয়, বরং মায়ের শারীরিক শক্তি, মানসিক সুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনা।




